গৌতম বুদ্ধের একটি গভীর জীবনঘনিষ্ঠ বাণী হলো—
“সে আমাকে গালি দিয়েছে, প্রহার করেছে,পরাস্ত করেছে বা লুণ্ঠন করেছে—যারা মনে এমন চিন্তা পোষণ করে, তাদের হিংসা ও বৈরিতা কখনো শেষ হয় না।”
এই বাণী শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং মানবমনের এক চিরন্তন সত্যের প্রকাশ। মানুষের জীবনে অপমান, অবিচার, কষ্ট কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোকে যদি আমরা ক্রমাগত হৃদয়ে ধারণ করি, তাহলে ক্ষত শুকায় না; বরং আরও গভীর হয়। তখন অন্যের প্রতি ঘৃণা জন্মায়, আর সেই ঘৃণা শেষ পর্যন্ত নিজের মনকেই বিষাক্ত করে তোলে।
গৌতম বুদ্ধ উপলব্ধি করেছিলেন, প্রতিশোধ কখনো শান্তি এনে দেয় না। কারণ প্রতিশোধের আগুনে প্রথমে পুড়ে যায় প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তির নিজের হৃদয়। যে মানুষ সারাক্ষণ অন্যের অন্যায় স্মরণ করে, সে নিজের সুখ, প্রশান্তি ও মানসিক স্বাধীনতাকেও বন্দী করে রাখে। তাই তিনি শিক্ষা দিয়েছেন—মুক্তি অন্যকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং নিজের অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত করার মধ্যে।
বৌদ্ধ দর্শনে ‘মৈত্রী’ ও ‘করুণা’ মানবজীবনের সর্বোচ্চ গুণগুলোর অন্যতম। মৈত্রী শেখায় সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করতে, আর করুণা শেখায় অন্যের কষ্ট অনুভব করতে। এই দুই গুণের চর্চা মানুষকে প্রতিহিংসার পথ থেকে দূরে সরিয়ে শান্তির পথে পরিচালিত করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শিক্ষা বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও আধ্যাত্মিক ধারায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ইসলাম ক্ষমা ও সংযমকে মহৎ গুণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। খ্রিস্টধর্ম ভালোবাসা ও ক্ষমার আদর্শ তুলে ধরেছে। হিন্দুধর্ম অহিংসা ও সহনশীলতাকে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ সত্যিকারের ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে না; বরং হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়।
তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা এবং নিজের অধিকার রক্ষা করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সংগ্রাম যদি ঘৃণা ও প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে তা নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। আর যদি ন্যায়, বিবেক ও মানবিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তা সমাজে শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ ধর্ম, জাতি, মতাদর্শ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে একে অপরের প্রতি ক্রমশ বৈরী হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পারিবারিক সম্পর্ক পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষোভ ও বিদ্বেষের ছাপ স্পষ্ট। এমন সময়ে গৌতম বুদ্ধের এই বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ঘৃণাকে ঘৃণার মাধ্যমে জয় করা যায় না; ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ক্ষমাই তার একমাত্র প্রতিষেধক।
মানুষের প্রকৃত বিজয় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং নিজের ক্রোধ, অহংকার ও প্রতিহিংসাকে জয় করার মধ্যে। যে হৃদয় ক্ষমা করতে পারে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে মুক্ত। আর যে সমাজ ক্ষমা, সহনশীলতা ও মানবিকতাকে ধারণ করে, সেই সমাজেই শান্তি ও সম্প্রীতির ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
তাই আসুন, অতীতের ক্ষতকে আঁকড়ে না ধরে ক্ষমার আলোয় নিজেদের আলোকিত করি। কারণ হিংসা ও বৈরিতার পথ অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, আর ক্ষমা ও মমতার পথই মানুষের সত্যিকারের মুক্তি ও শান্তির পথ।
লেখক – সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ
গণমাধ্যম ও সমাজ কর্মী
আলীকদম।