দুর্গম বিলাইছড়ির পাহাড়ে আগুনের তাণ্ডব — মুহূর্তে পুড়ে ছাই ৫ জুম চাষী পরিবারের বসতঘর
উচ্চপ্রু মারমা, রাজস্থলী (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :
প্রাপ্তবয়স্করা জুমে, পাড়ায় ছিল শুধু শিশু — অসহায়ত্বের সুযোগে ছড়িয়ে পড়ে আগুন; খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন, রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে এক হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে অন্তত পাঁচটি জুম চাষী পরিবার। বসতঘর, খাদ্য মজুত, পোশাক, দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী—সবকিছুই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বর্তমানে এসব পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে, যেখানে নেই পর্যাপ্ত খাবার, নেই নিরাপদ আশ্রয়।
উপজেলার ৩ নম্বর ফারুয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পানছড়ি ত্রিপুরা পাড়ায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন বা বাইরের লোকজনের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে পাড়ার একটি পরিবারের রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। পাহাড়ি এলাকায় বসতঘরগুলো সাধারণত বাঁশ, কাঠ, খড় ও টিন দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড বাতাস এবং শুকনো আবহাওয়ার কারণে আগুন মুহূর্তেই পাশের ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পুরো পাড়াজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাড়াটিতে মোট ৭ থেকে ৮টি পরিবারের বসবাস ছিল, যার মধ্যে ৫টি পরিবারের বসতঘর সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়।

ঘটনার সময় পাড়ার অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি জুম চাষের কাজে পাহাড়ের দূরবর্তী এলাকায় অবস্থান করছিলেন। পাড়ায় তখন কেবল শিশু ও কিশোররা ছিল। ফলে আগুন লাগার পর সেটি নিয়ন্ত্রণে আনার মতো কেউ এগিয়ে আসতে পারেনি।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “শিশুরা শুধু চিৎকার করেছে, কিন্তু আগুন নেভানোর মতো শক্তি বা উপায় তাদের ছিল না। বড়রা থাকলে হয়তো কিছুটা হলেও ক্ষতি কমানো যেত।”
তারাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা সুভাষ ত্রিপুরা বলেন, আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে যে কেউ ঘর থেকে কিছু বের করতে পারেনি। টাকা-পয়সা, চাল-ডাল, কাপড়—সব পুড়ে গেছে। এখন তারা একেবারে নিঃস্ব।”
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকের ঘরে থাকা জুম ফসল, শুকনো খাদ্য মজুত এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও আগুনে পুড়ে গেছে। এতে তাদের ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এক ক্ষতিগ্রস্ত নারী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় থাকবো, কী খাবো—কিছুই বুঝতে পারছি না।”
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। কেউ কেউ অস্থায়ীভাবে প্রতিবেশীদের সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে, তবে বেশিরভাগ পরিবারই খোলা জায়গায় দিন-রাত পার করছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, পোশাক ও চিকিৎসা—সবকিছুরই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শিশুদের মধ্যে অসুস্থতা ও অপুষ্টির ঝুঁকিও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “আমরা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চাল, ডাল, তেল ও কম্বল দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, ফারুয়া সাব-জোনের কমান্ডার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসনাত জাহান খান বলেন, “এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় খবর পেতে দেরি হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে শুকনো খাবার ও জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।”
পানছড়ি ত্রিপুরা পাড়াটি এমন একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত সীমিত। বর্ষা মৌসুমে এলাকা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মোবাইল নেটওয়ার্কও অপ্রতুল, ফলে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।
ফায়ার সার্ভিসের কোনো ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি—যা এই ধরনের দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার অন্যতম কারণ।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন—স্থায়ী বা অস্থায়ী বসতঘর নির্মাণ,পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা, পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা
পাহাড়ি এসব জুম চাষী পরিবার প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করে। তাদের জীবনে একটি দুর্ঘটনাই বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে তারা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্গম এলাকায় অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, বিলাইছড়ির এই অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকটি পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়নি, বরং তাদের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন এবং টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।





