রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবান রুমায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল হাসান এর দূরদর্শী পরিকল্পনায় রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাম (Measles) রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যসেবা-বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে দীর্ঘ দূরত্বের কারণে চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন—এমন তিনটি পাড়ায় এ ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়।
গত (৫ আগস্ট) ২০২৬ তারিখে রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের নিয়াংক্ষ্যং পাড়া, চাইরাগ্র পাড়া ও পরুয়া পাড়ায় রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং হেলেন কেলার ও তহজিংডং প্রকল্পের এর যৌথ ব্যবস্থাপনায় এ বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি রুমার বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, সীমিত যাতায়াত ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এসব এলাকার বাসিন্দাদের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও টিকাদানের আওতায় আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রতিকূল পাহাড়ি পরিবেশ ও দীর্ঘ দুর্গম পথ অতিক্রম করে মেডিকেল টিম তিনটি পাড়ায় পৌঁছে প্রায় ১৫০টি পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে। ক্যাম্পে রোগী পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের পাশাপাশি হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উপসর্গ সম্পর্কে অভিভাবকদের সতর্ক করা হয়। হাম প্রতিরোধে ২৪ শিশুকে এমআর টিকা চলমান হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর আওতায় ক্যাম্পে ২৪ জন শিশুকে এমআর (Measles-Rubella) টিকা দেওয়া হয়।
এ সময় অভিভাবকদের হাম রোগের লক্ষণ, সময়মতো টিকা গ্রহণের গুরুত্ব এবং শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দাগ বা হামসদৃশ কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের বিষয়ে সচেতন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলেন, দুর্গম এলাকায় সরাসরি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে।
ক্যাম্পে শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় ১০টি ম্যালেরিয়া Rapid Diagnostic Test (RDT) সম্পন্ন করা হয়।
এর পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। ফলে একই ক্যাম্পে চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, টিকাদান, পুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধ—সবকটি সেবা সমন্বিতভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় মেডিকেল ক্যাম্পে স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হয়। শিশুদের পূর্ণাঙ্গ টিকাদান নিশ্চিত করা, হাম রোগের উপসর্গ দ্রুত শনাক্ত করা, জ্বর বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং শিশুদের যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্গম এলাকায় এ ধরনের মেডিকেল ক্যাম্প শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদানের আওতায় আনা এবং রোগ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মেডিকেল ক্যাম্পের নেতৃত্ব দেন রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রুবেল মোস্তফা। তাঁর নেতৃত্বে মেডিকেল টিম মাঠপর্যায়ে রোগী পরীক্ষা, চিকিৎসা প্রদান, শিশুদের স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, টিকাদান কার্যক্রম এবং ম্যালেরিয়া পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে।

কর্মসূচিতে তহজিংডং উপজেলা কো-অর্ডিনেটর ইটেন ত্রিপুরা, পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মার্মা, সাকমো অভিজিৎ চাকমা, জেলা EPI টেকনিশিয়ান উবামং মার্মা, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর কামরুল হাসান, EPI কর্মী, স্বাস্থ্য সহকারী এবং তহজিংডং-এর CNP সদস্যরা অংশ নেন। স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা করেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট পাড়াগুলোর সরকারি শিক্ষকরা। দুর্গম এলাকায় জনগণকে সংগঠিত করা, ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় স্থানীয় সমন্বয়ে সহযোগিতা করেন পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
মেডিকেল ক্যাম্পটি সফলভাবে বাস্তবায়নে হেলেন কেলার ও তহজিংডং প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সার্বিক সহযোগিতা ছিল বলে আয়োজকরা জানান। দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য আয়োজকদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও যোগাযোগগত প্রতিবন্ধকতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের আসার অপেক্ষায় না থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্গম এলাকায় গিয়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার এ ধরনের উদ্যোগকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে হামসহ সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদানের আওতায় আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন ডেস্ক