মথি ত্রিপুরা, রুমা প্রতিনিধি:
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় চলমান অকটেন সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন শতাধিক মোটরবাইক চালকরা। যাদের অনেকেই প্রতিদিন ভাড়া চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন। পাহাড়ি এই অঞ্চলে মোটরবাইকই অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম এবং বহু পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। হঠাৎ করে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় এসব চালকের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রুমা উপজেলার অধিকাংশ চালকের কোনো স্থায়ী চাকরি বা ব্যবসা নেই। প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করে যে আয় হতো, তা দিয়েই চলতো সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ঋণের কিস্তি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আয়ের পথ প্রায় বন্ধ। এরই মধ্যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী উৎসব—বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু ও চাংক্রান—চলমান থাকলেও অনেক চালকের ঘরে নেই উৎসবের আনন্দ। বরং অর্থকষ্ট, অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তাই তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
মোটরবাইক চালকরা আন্তনি ত্রিপুরা বলেন, তেলের তীব্র সংকটে আমরা চরম সমস্যায় আছি। একদিকে আয় নেই, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। খুচরা বাজারে তেলের দামও অনেক বেশি, আবার ভালো মানের তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় কেরোসিন মিশ্রিত তেল বিক্রি করা হচ্ছে, এতে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আরেক চালক রাজীব দাস জানান, তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও ভেজাল। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইক বিক্রি করে দিচ্ছেন। আমিও আমার বাইকটি বিক্রি করে দিয়েছি। খুচরা দোকান থেকে ২০০-২৫০ টাকা দরে তেল কিনতে হচ্ছে। এজন্য ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে, যা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই বিরোধও সৃষ্টি হচ্ছে। আবুমং মারমা নামে আরেক চালক বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। সাংগ্রাই উৎসবও ভালোভাবে উদযাপন করতে পারছি না। পরিবারে চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই। অন্যদিকে যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।

এক যাত্রী ক্রাংএং খুমী জানান, আগে রুমা বাজার থেকে বগালেক পর্যন্ত ভাড়া ছিল ৫০০-৬০০ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০-১০০০ টাকায়। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। স্থানীয় চালকদের অভিযোগ, রুমা বাজারে কিছু তেল পাওয়া গেলেও তা স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করা হয় না। বরং বাইরের ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এছাড়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভেজাল তেল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
একাধিক চালক জানান, অকটেনের সঙ্গে কেরোসিন মিশিয়ে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ইঞ্জিন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসনের তদারকি না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। নহ ত্রিপুরা বলেন,আগে যেখানে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো, এখন অনেকেই গাড়ি বের করতেই পারছেন না। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক চালক এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, কিন্তু আয় না থাকায় কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সংকটময় পরিস্থিতিতে এখনো প্রশাসন বা কোনো বেসরকারি সংস্থার দৃশ্যমান সহায়তা পাওয়া যায়নি। এতে নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, ভেজাল তেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মোটরবাইকচালকদের জন্য বিশেষ সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল বা আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা জরুরি। অন্যথায় এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অনলাইন ডেস্ক