প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬ । ১২:১১ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

​মুখোশের আড়ালে আধুনিকতা ; তিন পার্বত্য জেলার জীবন-সংগ্রাম এবং আমাদের অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি

অনলাইন ডেস্ক

 

ছন্দ সেন চাকমা ; 

​আজকের বিশ্বকে আমরা বলছি ‘সভ্য ডিজিটাল যুগ’। হাতের মুঠোয় প্রযুক্তি, চোখের সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর জীবনযাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু এই তথাকথিত সভ্যতার ঝকমকে আলো কি আসলেই সবার জীবনে আলো ছড়াতে পেরেছে? নাকি এই আলো তীব্র এক অন্ধত্ব তৈরি করেছে আমাদের চশমা পরা চোখে?

একজন ফটোসাংবাদিক ও ভিডিও প্রামাণ্য চিত্র নির্মাতা হিসেবে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে, এনজিওদের সাথে যখন এক পাহাড়ি গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ক্যামেরা কাঁধে ঘুরি, তখন সভ্যতার এক ভিন্ন এবং নির্মম রূপ চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

​আমার ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে তিন পার্বত্য জেলার সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা আদিবাসীদের আদিম ও খাঁটি জীবন-সংগ্রাম। কোথাও মাইলের পর মাইল পাহাড় জুম চাষের জন্য পুড়িয়ে কালো করে ফেলা হয়েছে (যা জুমের চিরাচরিত নিয়ম), আবার কোথাও সেই পোড়া কালো ছাইয়ের বুক চিরে জেগে উঠছে কচি সবুজ চারা। কোথাও বাঁশ আর ছনের তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘরের নিচে পরম মমতায় পোষা শূকর আর মুরগির দল বেঁধে খাবার খাওয়ার দৃশ্য।

​তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে দৃশ্যটি আমার ক্যামেরাকে কাঁদিয়ে ছাড়ে, তা হলো পাহাড়ের তীব্র পানির সংকট। মাইলের পর মাইল দুর্গম পাহাড়ি পথ, উঁচুনীচু ছড়া আর খাড়া পাহাড় বেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে এক কলসি বা এক থুরং খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় পাহাড়ি জুমিয়া নারীদের। এই তীব্র পানির সংকট মোকাবেলা করে নিজের পরিবারের জীবনগুলোকে টিকিয়ে রাখাই যেন এই নারীদের জীবনের প্রথম এবং প্রধান সংগ্রাম।

​প্রকৃতি আর জীববৈচিত্র্যকে বুকে আগলে রেখে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান অঞ্চলের মানুষেরা বেঁচে থাকার যে লড়াইটা প্রতিদিন করে, তা কোনো রূপকথা নয়। একজন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে দুর্গম পাহাড়ে হেঁটে, খেয়ে-না খেয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পানির সংকট ও মানবেতর জীবনের চিত্রগুলো ক্যামেরাবন্দী করি। লক্ষ্য একটাই—যাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থার কাছে এই বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরা যায় এবং পাহাড়ের মানুষ একটু সুপেয় পানির অধিকার পায়।

​কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই ডিজিটাল যুগে এসে কিছু বিশেষ মহল পাহাড়ের এই সরল, মেহনতি মানুষদের দিকে কুৎসিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকায়। ফেসবুকের দুনিয়ায় কিছু অসচেতন ব্যক্তি এবং একদল ‘ফেক আইডি’র আড়ালে থাকা মানুষ কোনো সত্যতা না জেনে, মাঠপর্যায়ের কষ্ট না বুঝে ঘরে বসে সস্তা সমালোচনা করে। তারা এই বাস্তব প্রামাণ্যচিত্রগুলোকে নিয়ে ট্রল করে বা মিথ্যাচার ছড়িয়ে নিজেদের মস্ত বড় জ্ঞানী ও ‘জাতিপ্রেমী’ প্রমাণ করার এক অপপ্রয়াস চালায়।

​সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই সমালোচকদের অনেকেই আবার বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের অধিকারী, তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত মানুষ! কিন্তু যে শিক্ষা মানুষকে অন্যের তীব্র কষ্টকে অনুধাবন করতে শেখায় না, যে শিক্ষা চার দেয়ালের বাইরে পাহাড়ের নারীদের মাইলের পর মাইল পানি টানার বেদনা বুঝতে দেয় না—সেই সার্টিফিকেটধারী শিক্ষা আসলে এক ধরনের অন্ধত্ব। এই মানসিকতা আদিবাসীদের অনগ্রসরতা প্রকাশ করে না, বরং প্রকাশ করে আমাদের তথাকথিত ‘আধুনিক ও शिक्षित’ সমাজের ভেতরের চরম অসভ্যতা, অহংকার ও মানবিক দৈন্যদশা।

​পরের ভেতরের কষ্ট না জেনে, তার জীবনের গল্পটা না বুঝে দূর থেকে বিচার করা বা তাকে নিয়ে উপহাস করা যে কত বড় অপরাধ, তা বোঝাতে একটি চেনা অথচ গভীর রূপক গল্প মনে পড়ে যায়।

​এক জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে এক ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিল সে পাঁচ তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যখন সে ছাদের কার্নিশে দাঁড়াল, ঠিক তখনই তার চোখ গেল নিচের রাস্তার দিকে। সে দেখল, নিচে এক ভিখারি—যার হাত নেই, পা নেই—সে মাটির বুকে অদ্ভুতভাবে লাফালাফি করছে। কিছুটা দূরে একটা চায়ের দোকানে সাউন্ড বক্সে চড়া সুরে গান বাজছে, আর মনে হচ্ছে সেই ভিখারি যেন গানের তালে তাল মিলিয়ে মনের সুখে নাচছে!

​ছাদের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির মনে তীব্র কৌতূহল আর খটকা লাগল। সে ভাবল, “আমার হাত-পা, চোখ-কান সব ঠিক আছে, শুধু মনের তীব্র কষ্টে আমি জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিতে যাচ্ছি। আর এই মানুষটার কিচ্ছু নেই, তাও সে এই গানের তালে এমন পরম সুখে নাচছে কীভাবে?”

​কৌতূহল সামলাতে না পেরে লোকটি ছাদ থেকে নেমে এলো। ভিখারির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, তোমার এই আনন্দের রহস্য কী? হাত-পা ছাড়া এই তীব্র অভাবেও তুমি কীভাবে এত সুন্দর নাচছ?”

​ভিখারি তখন বিষাদমাখা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, আপনি দূর থেকে যাকে আনন্দ বা নাচ দেখছেন, তা আসলে আমার জীবনের চরম ছটফটানি। আমার হাত নেই, পিঠে তীব্র চুলকানি উঠেছে। সেই চুলকানি সহ্য করতে না পেরে পিঠটা মাটিতে ঘষার জন্য আমি এভাবে লাফাচ্ছি। দূর থেকে গান বাজছে বলে আপনার মনে হলো আমি সুখে নাচছি। ভাই, দূর থেকে কোনো মানুষকে খারাপ বা সুখে থাকার ভুল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করবেন না। কাছে এসে দেখুন, বুঝুন কে কত অসহায় আর কার জীবনের গল্পটা কেমন। না জেনে, না বুঝে অপরের কষ্টকে আনন্দ বা অপরাধ মনে করাটা কত বড় অন্যায়!”

​এই গল্পটি আমাদের ফেসবুকের তথাকথিত ‘অনলাইন পণ্ডিত’ আর সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত সমাজের ওপর একটি বড় চপেটাঘাত। পাহাড়ের পুড়ো মাটি, জুমের ঢালু পাহাড়, পানির জন্য দীর্ঘ পথ চলা, কিংবা মাটির উঠানে ঘরের প্রাণীদের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর দিকে যখন সমতলের বা আধুনিক সমাজের একাংশ অবজ্ঞার চোখে তাকায়, তখন তারা আসলে সেই ছাদের ওপরের লোকটির মতোই ভুল করে।

​দূর থেকে এসি রুমে বসে কমেন্ট বক্সে ঝড় তোলা খুব সহজ, কিন্তু রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা বান্দরবানের দুর্গম পাড়াগুলোতে রোদে পুড়ে, পায়ে হেঁটে পানি আনার কষ্টটা বুঝতে হলে আগে নিজের ভেতরের অহংকারটা ভাঙতে হয়। তীব্র রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে পাহাড়ি মা তার মাচাং ঘরের পাশে বসে হাসিমুখে মুরগি আর গবাদিপশুগুলোকে খাওয়াচ্ছেন, তার সেই কষ্টের হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে প্রতিদিনের টিকে থাকার এক মানবেতর যুদ্ধ।

​কারও ভেতরের গভীর ক্ষত বা জীবনযুদ্ধ না জেনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা, কিংবা তাদের অধিকার ও কষ্টকে উপহাস করা এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। তিন পার্বত্য জেলার এই মানুষগুলো দয়া চায় না, তারা চায় একটু সহানুভূতি, একটু সম্মান এবং তাদের স্বতন্ত্র জীবনযাত্রার স্বীকৃতি।

​একজন ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টারি নির্মাতা হিসেবে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রতিটি দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়া আমার জন্য শুধু পেশা নয়, এটি একটি মানবিক দায়বদ্ধতা। এই কাজগুলো করতে গিয়ে আমাকে অনেক আর্থিক অনটন, শারীরিক ক্লান্তি আর যাতায়াতের তীব্র কষ্ট সহ্য করতে হয়। অনেক সময় নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে ক্যামেরার পেছনে দিনের পর দিন পড়ে থাকতে হয়, যেন পাহাড়ের এই বঞ্চিত মানুষদের আসল কান্নাটুকু পৃথিবীর দরবারে পৌঁছানো যায়।
​আজ সময় এসেছে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত সমাজ ও অসচেতন নেটিজেনদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। আসুন, স্ক্রিনের ওপারে বসে ফেক আইডি দিয়ে অবজ্ঞা বা ভুল বিচার না করে, কাছে এসে তাদের ভেতরের অসহায়ত্ব আর জীবনের আসল গল্পটা বুঝি। পাহাড়ের এই আদিবাসী ভাইবোনদের জীবন-সংগ্রামকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুধাবন করি। একই সাথে, একজন স্বাধীন নির্মাতা হিসেবে এই সত্যগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য সচেতন মহলের মানসিক ও সামাজিক সমর্থন আমার বড্ড প্রয়োজন। আপনারা পাশে না দাঁড়ালে, সত্যের এই লেন্সটি একদিন হয়তো চিরতরে নিভে যাবে।

​কারণ, দৃষ্টিভঙ্গি যদি মানবিক না হয়, তবে সার্টিফিকেটের স্তূপ যতই বড় হোক আর ডিজিটাল দুনিয়া যতই উন্নত হোক না কেন—মানুষ হিসেবে আমরা অন্ধকারেই থেকে যাব।

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ঘাগড়া, কাউখালী, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।

কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন