ছন্দ সেন চাকমা, রাঙ্গামাটি :
ষাটের দশকের শুরুতে পাহাড়ি জনপদের বুক চিরে যখন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন রাষ্ট্র একে দেখেছিল ‘উন্নয়ন’ হিসেবে। কিন্তু রাঙ্গামাটির পাহাড় আর উপত্যকার মানুষের কাছে তা আজও এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। এই একটি মাত্র বাঁধের কারণে সে সময় প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টর স্থায়ী ও ASGI ধানের জমি চিরতরে পানির নিচে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি হারিয়ে উচ্ছেদ হতে হয়েছিল লাখেরও বেশি মানুষকে। সেই ‘বড় পরং’ বা মহা-উদ্বাস্তু হওয়ার ক্ষত পাহাড় আজও বয়ে বেড়াচ্ছে।
বছরের পর বছর পার হলেও কাপ্তাই হ্রদের পানির ওঠানামার সাথে এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাগ্য যেন এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর জুয়াখেলায় মেতে থাকে। বিশেষ করে বর্তমানের এই তীব্র শুকনো মৌসুমে হ্রদের পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রার সংকট যেমন চরম রূপ ধারণ করেছে, তেমনি পানির নিচ থেকে ভেসে উঠছে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের নানা খণ্ডচিত্র।
হাজরী বাগের অলৌকিক গাছ:
অতিত ও বর্তমানের এক জীবন্ত সাক্ষী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবারের শুকনো মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে গেছে। আর পানি শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই রাঙ্গামাটির হাজরী বাগ এলাকায় হ্রদের বুক চিরে জেগে উঠেছে বহু বছরের পুরনো এক নিঃসঙ্গ গাছ। কাপ্তাই বাঁধের আগে যে বিস্তীর্ণ জনপদ ছিল, এই গাছটি মূলত সেই সময়কার। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে পানির নিচে ডুবে থাকার পরও গাছটি যেভাবে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তা এক পরম বিস্ময়।
এই গাছটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে এক অলৌকিক ইতিহাস। জানা যায়, হ্রদের পানি শুকিয়ে গেলে বিভিন্ন সময়ে অনেকেই এই মূল্যবান গাছটি কেটে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু লোকবিশ্বাস রয়েছে, যখনই কেউ লোভের বশে বা খারাপ উদ্দেশ্যে এই গাছটি কাটতে গেছে, তখনই অলৌকিকভাবে গভীর রাতে স্বপ্নের মাধ্যমে তাকে সতর্ক বা নিষেধ করা হয়েছে।
স্বপ্নে পাওয়া সেই দৈব বার্তার ভয়ে এবং গাছটির প্রতি এক ধরণের সমীহ থেকে পরবর্তীতে আর কেউ একে কাটার সাহস করেনি। কোনো লোভ বা কুদৃষ্টি একে স্পর্শ করতে পারেনি বলেই আজ এত বছর পরও কাপ্তাই বাঁধের সেই প্রাচীন স্মৃতি হ্রদের তলদেশে অক্ষত রয়ে গেছে। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই গাছটি কেবল একটি কাঠের টুকরো নয়, বরং তাদের পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটির শেষ চিহ্ন এবং এক পরম শ্রদ্ধার প্রতীক।
ডুবো জমি ও বর্তমানের জীবিকা সংকট :
কাপ্তাই হ্রদের চারপাশের পাহাড়ি মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে হ্রদের তীরবর্তী ‘ডুবো জমি’। বর্ষায় হ্রদের পানি যখন উপচে পড়ে, তখন জমিগুলো তলিয়ে থাকে। আর শীতের শেষে যখন পানি নেমে যায়, তখন জেগে ওঠা পলিমাটিতে চাষাবাদ করে স্থানীয় কৃষকেরা তাদের সারা বছরের খাদ্য সংস্থান করেন। কিন্তু এখন পানির স্তর মারাত্মকভাবে ওঠানামা করছে। এবারের শুকনো মৌসুমে পানি এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, অনেক এলাকায় সেচের জলের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। যে জমিতে সোনালী ধানের হাসি থাকার কথা ছিল, পানির অভাবে তা আজ ফেটে চৌচির। প্রখর রোদে পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন।
থমকে গেছে যাতায়াত, ব্যাহত জীবনযাত্রা :
কাপ্তাই হ্রদ কেবল একটি কৃত্রিম জলাশয় নয়, এটি রাঙ্গামাটির দুর্গম উপজেলাগুলোর যোগাযোগের প্রধান মহাসড়ক। শুকনো মৌসুমে হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু দূরবর্তী পাহাড়ি গ্রাম। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত জুমের ফসল বা শাকসবজি এখন আর সহজে সদরের বাজারে নিয়ে আসা যাচ্ছে না। যেখানে নৌকায় কয়েক ঘণ্টায় যাতায়াত করা যেত, সেখানে এখন মাইলের পর মাইল হেঁটে, অতিরিক্ত খরচ ও শারীরিক কষ্ট স্বীকার করে মানুষকে পথ চলতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন অন্তঃসত্ত্বা নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা, যাদের জরুরি চিকিৎসায় হাসপাতালে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পানির নিচে ইতিহাস, উপরে খাবার জলের হাহাকার :
যে হ্রদের পানি উৎপাদনে দেশের একটা অংশ আলোকিত হয়, সেই হ্রদের চারপাশের মানুষ আজ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। শুকনো মৌসুমে হ্রদের পানি দূষিত ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় ঝর্ণার বিশুদ্ধ পানিও মিলছে না। ফলে হ্রদের তীরবর্তী গ্রামগুলোতে দেখা দিচ্ছে পানিবাহিত নানা রোগ।
যে ৫৪ হাজার হেক্টর ধানের জমি পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল, তা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। হাজরী বাগের অলৌকিক গাছটির মতো অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন পানির নিচে চাপা পড়ে আছে, কিন্তু সেই উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বর্তমান প্রজন্ম আজও এক অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি।
শেষ কথা :
কাপ্তাই বাঁধ সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত পাহাড়ের মানুষের ত্যাগকে রাষ্ট্র কতটা মূল্যায়ন করেছে, সেই প্রশ্ন রয়েই যায়। কাপ্তাই হ্রদকে কেন্দ্র করে পর্যটনের জৌলুস বাড়লেও, হ্রদের ওপর নির্ভরশীল আদিবাসী মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
শুকনো মৌসুমের এই মানবিক সংকট দূর করতে হলে হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা (ড্রেজিং), দুর্গম এলাকায় বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সংকটকালীন সময়ে প্রান্তিক চাষীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। পাহাড়ের মানুষের বুকের ওপর বয়ে চলা এই কৃত্রিম হ্রদ যেন তাদের চিরস্থায়ী কান্নার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে এখনই নজর দেওয়া প্রয়োজন।

অনলাইন ডেস্ক