ছন্দ সেন চাকমা, বিশেষ প্রতিনিধি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহ চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রবল সংশয় ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আজকের দিনে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে স্থানীয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ’-এর মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি মূলত সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই এক যৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

স্মারকলিপির তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে একজন মন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমেই এই মন্ত্রণালয় গঠিত হবে। অথচ, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকার কর্তৃক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয়দের মতে চুক্তির বিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনায়। গত ১ জুন ২০২৬ তারিখে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেও, জনমনে প্রবল ধারণা রয়েছে যে তাকে এই পদে থাকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। একজন জনপ্রিয় প্রতিনিধিকে সরিয়ে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের এই ঘটনা পাহাড়ি জনপদ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।

এ পরিস্থিতিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ’ তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে। উপজাতীয় ব্যক্তিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগদান নিশ্চিত করা এবং দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিধান অনুসারে ‘উপদেষ্টা কমিটি’ অবিলম্বে কার্যকর করা। মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উপমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদে কাউকে নিয়োগ না দেওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা।

পরিশেষে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দীর্ঘ সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করে নেওয়া যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার ঝুঁকি রাখে। বর্তমান সংকট নিরসনে সরকারের উচিত অবিলম্বে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসা। মনে রাখতে হবে, জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নই পাহাড়ি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ। আস্থাহীনতা দূর করার প্রাথমিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই গ্রহণ করতে হবে।

অনলাইন ডেস্ক