মথি ত্রিপুরা, রুমা প্রতিনিধি:
টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও বান্দরবানের রুমা উপজেলার জনজীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। পাহাড় ধস, সড়ক দেবে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে মাটি-পাথর জমে থাকায় রুমা–বান্দরবান সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার হাজারো মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, জরুরি প্রয়োজন ও জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু B-70 যানবাহন ও মোটরসাইকেল চলাচল করলেও বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহন এখনো চলাচল করতে পারছে না। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা এই সড়কে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধস, সড়ক ভেঙে যাওয়া ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত। কয়েক বছর আগে ভয়াবহ পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছিল। তাই চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন পাহাড়ের ঢাল ভেঙে সড়কের ওপর মাটি ও পাথর নেমে এসেছে। এতে কয়েকটি স্থানে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া সড়কের বিভিন্ন অংশ দেবে যাওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিনু মার্মা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা প্রস্তুত শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত বুধবার বিকেলে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সার্বিক অবস্থা দেখতে উপজেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী।
এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সংকটের কারণে অনেকে অনলাইন ও অফলাইনভিত্তিক কাজ করতে পারছেন না। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় উদ্বেগ ও দুর্ভোগ বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, নিম্নআয়ের মানুষ এবং দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী জুমচাষিরা। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি জমিতে ধান, আদা, হলুদ, মরিচ, তিল, তুলা, শসাসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেকের জুমের জমি পাহাড় ধসে বিলীন হয়ে গেছে। পাহাড় ধসের আশঙ্কায় অনেক কৃষক জুমে যেতে পারছেন না। ফলে ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে। এতে এক বছরের পরিশ্রম ও স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে অনেক কৃষকের।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার থেকে বন্যাকবলিত আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। রুমা সদর ইউনিয়নের রুমা বাজার আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রুমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৪টি পরিবারের ১২৮ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া ৪ নম্বর গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের যথুরামপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে তিনটি পরিবারের ১৫ জন অবস্থান করছেন।

এদিকে টানা বর্ষণে রুমা বাজার থেকে ১ নম্বর সদরঘাট ও মুনলাইপাড়া পর্যন্ত কয়েকটি সেতু পানিতে তলিয়ে যায়। পানি কমতে শুরু করলেও সেতুগুলোর ওপর দিয়ে এখনো নিরাপদে চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। ছোট-বড় বেশ কয়েকটি সেতু ও কালভার্ট এখনো পানির নিচে থাকায় যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকার মাধ্যমে পারাপার করছেন। টানা সাত দিনের বৈরি আবহাওয়ার পরও থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। কবে বৃষ্টি থামবে এবং কবে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে—সেই অপেক্ষায় রয়েছেন রুমাবাসী।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, আরও কয়েক দিন এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জনদুর্ভোগ, খাদ্যসংকট এবং কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। তাই দ্রুত সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করা, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুনঃস্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে কার্যকর সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

অনলাইন ডেস্ক