পানছড়ি থেকে ফিরে এসে মিঠুন সাহা :
খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে উল্টাছড়ি ও আশপাশের এলাকাগুলো শিক্ষার দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। যাতায়াতের অসুবিধা ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা সেখানেই থেমে যেত।
উল্টাছড়ি এলাকা থেকে পানছড়ি বাজারের উচ্চ বিদ্যালয়গুলো ছিল অনেক দূরে। ফলে প্রতিদিন দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন ছিল। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পক্ষে বাড়তি শিক্ষা ব্যয় বহন করাও সম্ভব হতো না। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পর অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়ে উঠত না।
এমন বাস্তবতায় ১৯৯৯ সালে উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এলাকাবাসীর জন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের পাশাপাশি এলাকার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। তাঁর উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধীরে ধীরে এলাকার শিক্ষার চিত্র বদলাতে শুরু করে।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাছেই স্বল্প খরচে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ পায়। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং পড়ালেখার প্রতি উৎসাহিত করতেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০১০ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়। বর্তমানে উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে শুধু উল্টাছড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরাই নয়, মরাটিলা, জিয়ানগর, মধ্যনগর, মোল্লাপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। কেউ কেউ নিজেদের মেধা ও যোগ্যতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিতও হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়টি এখন শুধু একটি এলাকার নয়, আশপাশের কয়েকটি এলাকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আজকের জনবাণী পত্রিকার পানছড়ি প্রতিনিধি আল-আমিন হোসেন বলেন, “উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চলের শিক্ষার চিত্র ছিল অনেকটা হতাশাজনক। বিশেষ করে যাতায়াতের অসুবিধা ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। ১৯৯৯ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে উল্টাছড়ি, মরাটিলা, জিয়ানগর, মধ্যনগর, মোল্লাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে একটি পিছিয়ে থাকা এলাকার শিক্ষার পরিবেশ পরিবর্তন করতে পারে, উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বিদ্যালয়ের মূল উদ্যোক্তা প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামসহ যারা প্রতিষ্ঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদান অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।”
স্থানীয়দের মতে, উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এলাকার শিক্ষার চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যে এলাকায় একসময় যাতায়াতের অসুবিধা ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার পর অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা থেমে যেত, আজ সেই এলাকার শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় তাই শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি পিছিয়ে থাকা জনপদের শিক্ষার অগ্রযাত্রা ও পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রতীক। আগামী দিনে আরও উন্নত শিক্ষা পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হলে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

অনলাইন ডেস্ক