চিংথোয়াই অং মার্মা,
থানচি (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
পাহাড়, নদী, ঝিরিঝর্ণা আর বৈচিত্র্যময় নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বান্দরবানের থানচিতে পর্যটনের বিস্তার ঘটলেও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে দর্শনীয় স্থানগুলোর ঐতিহ্যবাহী নাম ও ইতিহাস। প্রতিবছর প্রকৃতির টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। তবে পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যাপ্ত নামফলক, তথ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক স্থান ধীরে ধীরে নতুন ও অনানুষ্ঠানিক নামে পরিচিত হয়ে উঠছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন নাম, লোককথা ও ইতিহাসের সাংস্কৃতিক পরিচয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পর্যটনখ্যাত স্থানের ঐতিহ্যবাহী নাম ও নামকরণের ইতিহাস সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেই। নেই কোথাও নামফলক, কোথাও থাকলেও স্থানটির নামের উৎপত্তি বা ইতিহাসের কোনো তথ্য নেই। ফলে পর্যটকেরা স্থানগুলোর প্রকৃত পরিচয় না জেনেই ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঐতিহ্যের নামটির বাংলার অনুবাদ করে নতুন কোনো নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সেটিই অনেক সময় প্রচলিত হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী নামগুলো বাংলায় অনুবাদ ও নতুন নামে পরিচিত করতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের নাম ও পরিচয়। তারমধ্যে ক্রাউ মক্যাহ্ টং বদলে হয়েছে ডিম পাহাড়, ঙাহ্ফাখুং থেকে নাফাখুম, বংড আস্বাং ক্যহলুং থেকে রাজাপাথর এবং ক্যাহপাজ্জা: থেকে বাঘের মুখ—এমন নামকরণে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পর্যটনখ্যাত পর্যটনসহ বিভিন্ন স্থান ঘিরে রয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের স্মৃতি, লোককথা ও ইতিহাস। কিন্তু এসব স্থানের নামের উৎপত্তি, স্থানীয় তাৎপর্য কিংবা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে পর্যটনকেন্দ্রের পরিচিতি বাড়লেও হারিয়ে যাচ্ছে সেসব স্থানের নিজস্ব ঐতিহ্যের নাম!
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি পর্যটনকেন্দ্রের পরিচয় শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানটির নাম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ তথ্যভিত্তিক সাইনবোর্ড ও নির্ভরযোগ্য পরিচিতি না থাকায় পর্যটকেরা এসব বিষয়ে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা নুমংপ্রু মারমা, মালিরাম ত্রিপুরা ও মংছোহ্রী মারমাসহ অনেকেই জানান, পাহাড়, ঝিরিঝর্ণা ও পর্যটন স্পটগুলোর অনেক নাম পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই প্রচলিত। এসব নামের সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে সেসব ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ না থাকায় একসময় ঐতিহ্যবাহী নামগুলো হারিয়ে যেতে পারে।
রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) বলেন, পর্যটন স্পটগুলোর ঐতিহ্যবাহী নাম ও স্থানীয় সংস্কৃতি সাইনবোর্ডের মাধ্যমে তুলে ধরে সংরক্ষণ করা গেলে পর্যটকদের কাছে এসব স্থানের সঠিক পরিচিতি ও ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব হবে।

পরিবেশবাদী যুব সংগঠন গ্রীন ভয়েসের পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়ক সাচিনু মারমা বলেন, পাহাড়ের পর্যটন স্পটের নাম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। নাম পরিবর্তন বা বিকৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব পর্যটন স্পটগুলোর ঐতিহ্যবাহী নাম সংরক্ষণ ও নামকরণের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল জানান, তথ্যসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানের দর্শনীয় নাম উল্লেখ করে ছোটআকারে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী নাম সংরক্ষণে বিষয়টি জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করা হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, থানচির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যটন স্পটে স্থায়ী নামফলক স্থাপনের পাশাপাশি নামের উৎপত্তি, ইতিহাস, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বাংলা এবং ইংরেজিতে তুলে ধরা জরুরি। এতে পর্যটকেরা যেমন স্থানগুলোর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারবেন, তেমনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য এবং ইতিহাসও সংরক্ষিত থাকবে।

অনলাইন ডেস্ক