ঢাকা বিএসএসপি বিশ্ব শান্তি কুটিরে ১ম বারের মতো দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্টান সম্পন্ন
নিউটন চাকমা, সিএইচটি বার্তা, ঢাকা অফিস :
বিএসএসপি বিশ্ব শান্তি কুটির ঢাকা উত্তরায় ১৭ নাম্বার সেক্টরে অবস্থিত প্রথম বারের মতো মহাসমারোহে দান, শীল, ভাবনা ও প্রার্থনার পুণ্য আবহে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দানানুষ্টান।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল ৬টায় বুদ্ধ পতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে সকাল ৯টায় দিনব্যাপী বিএসএসপি বিশ্ব শান্তি কুটিরে ১ম দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসবে পূজনীয় ভিক্ষু সংঘের আগমন এবং ধর্মীয় সভায় অংশগ্রহণকারী ভিক্ষু সংঘকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেন পুণ্যার্থীরা। অনুষ্টানে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক দায়ক-দায়িকা, উপাসক-উপাসিকা ও পুণ্যার্থীগণ।

সকাল সাড়ে ৯টায় জয় জয় জয় বুদ্ধ পতাকা বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগীতের মাধ্যমে দিনব্যাপী অনুষ্টান শুভসূচনা করা হয়। এরপর পঞ্চশীল গ্রহণ, বুদ্ধমূর্তি দান, সংঘ দান, অষ্টউপকরণ দান, হাজার প্রদীপ দান, পিন্ডদানসহ নানাবিধ দানীয় সামগ্রী সম্পাদন করা হয়।
এসময় ধর্মীয় অনুষ্টানে বিএসএসপি বিশ্ব শান্তি কুটিরের ১ম কঠিন চীবর দানোৎসবে সভাপতিত্ব করেন বনভান্তের অন্যতম শিষ্য ও শান্তিপুর অরণ্য কুটিরের অধ্যক্ষ ভদন্ত শাসনরক্ষিত মহাস্থবির। এতে ঢাকায় অবস্থানরত সরকারি-বেসরকারি ও সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্টানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুশীল সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সুপ্রদীপ চাকমা, কঠিন চীবর দানের সদস্য সচিব বাবু প্রতীম চাকমা।

অনুষ্ঠানে ধর্মসভায় স্বধর্মদেশনা প্রদান করেন নারায়ণগঞ্জ বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ চন্দ্রবংশ মহাথেরো, বাসাবো আবাসিক প্রধান ভদন্ত কল্যান জ্যোতি মহাথেরো। এ সময় বনভান্তের অন্যতম শিষ্য ও শান্তিপুর বিশ্ব শান্তি কুটিরের প্রধান ভদন্ত শাসনরক্ষিত মহাস্থবিরসহ ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষুসংঘরা উপস্থিত ছিলেন। ধর্মসভায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ধর্মদেশনা শেষে সকাল ১১:৩০ ঘটিকায় পিন্ড গ্রহণ করেন।
বিকেল ১:০০ ঘটিকায় দানোত্তম কঠিন চীবর ও কল্পতুরু বিহারের প্রদক্ষিণ শেষে অনুষ্টানমঞ্চে আনা হয়। এরপর ভিক্ষুসংঘের আসন গ্রহণের পরপরই অনুত্তর পূণ্যক্ষেত্র ভিক্ষুসংঘের নিকট পশঞ্চশীল গ্রহণ, দানোত্তম কঠিন চীবর দান, সংঘদান, অষ্টউপকরণ দান, কল্পতরু দানসহ নানাবিধ উৎসর্গ করা হয়।

অনুষ্টানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কঠিন চীবর দান উদযাপন কমিটির আহ্ববায়ক শুভাশীষ চাকমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রাঙামাটির সংসদীয় ২৯৯ নং আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী এড. দীপেন দেওয়ান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম শরনার্থী বিষয়ক ও টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ডা: স্বপন কুমার চাকমাসহ বিভিন্ন দপ্তরের বর্তমান-সাবেক সরকারি-বেসরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত উপাসক-উপাসিকা, দায়ক-দায়িকা ও শত শত পূণ্যার্থীবৃন্দ।
অনুষ্টানে আগত পূণ্যার্থী ও তথা বিশ্বের সকল প্রাণীর হিতসুখ মঙ্গলানার্থে একটি বিশেষ প্রার্থনা পাঠ করা হয়। প্রার্থনাটি পাঠ করেন শ্রদ্ধাবতী উপাসিকা জিলিয়ান তালুকদার।
সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, একজন ব্যক্তি ধর্ম ছাড়া চলতে পারেনা, তেমনি ধর্ম ছাড়া ঐক্য গড়ে তোলা যায়না। ঐক্যই মুল চালিকাশক্তি ও পথপ্রদর্শক। সুতরাং সকল বৌদ্ধ জাতিকে ঐক্য থেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ধর্মকে রক্ষা করা, চর্চা ও সাধনা করতে অনুরোধ জানান। ধর্মই মানুষকে রক্ষা করে, তেমনি তিনি ধর্মকে পালন করেছেন বলেই আজ এই পদেই আসীন বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে চীবর দান অনুষ্টানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কঠিন চীবর দানের ধর্মীয় তাৎপর্য, বৌদ্ধধর্মে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার গুরুত্ব এবং মানবজীবনে দান ও নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, কঠিন চীবর দান কেবল কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে ত্যাগ, সংযম, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের শিক্ষা প্রতিফলিত হয়। দান ও শীলের চর্চা মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মৈত্রীর বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।

ধর্মীয় দেশনা শেষে ভিক্ষুসংঘের নিকট দানোত্তম কঠিন চীবরটি তুলে দেন বিএসএসপি বিশ্ব শান্তি কুটিরের উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সভাপতি পরিতোষ চাকমা, উদযাপন কমিটির আহ্ববাযক শুভাশীষ চাকমা ও সদস্য সচিব প্রতীম চাকমা। এরপর ক্রমান্বয়ে সারিবদ্ধ ভাবে আগত পূণ্যার্থীরা ভিক্ষুসংঘের নিকট নিজেদের চীবর দান করেন।

ঢাকা উত্তরায় ১৭ নাম্বার সেক্টরে অবস্থিত ১ম বারের মতো বিএসএসপি বিশ্ব শান্তি কুটিরে দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্টানের সকাল ও বিকেলের পর্বে শান্তি ব্রত চাকমা ও জিলিয়ান তালুকদারের সঞ্চালনায় দিনব্যাপী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে সুসম্পন্ন করা হয়।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় পূণ্যার্থীরা প্রদীপ প্রজ্বলন আয়োজন করেন।

| ৭ নভেম্বর ২০২৬












