| ৬ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম:

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা,

বিলাইছড়ি (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়নে প্রায় ৭০টি গ্রাম এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। নেই তেমন সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থাও। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস এবং পাহাড় পর্বতে ঘেরা এই এলাকাটি। মোট ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে  জনসংখ্যায় বেশি ফারুয়া ইউনিয়ন। ফারুয়া ইউনিয়নে আয়তন ২৮০ বর্গকিলোমিটার এবং বড়থলি ইউনিয়নের আয়তন ২৭৮ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা অনুসারে এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারী বেশি।

ডিজিটাল যুগে এসেও এখনো মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে রাঙামাটি বিলাইছড়ির ফারুয়া ও বড়থলি  ইউনিয়ন। ফারুয়া ৫০টি এবং বড়থলি ২০টি গ্রাম। দুই ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজারেও বেশি জনগণের বসবাস। মোবাইল ফোনে নেটওর্য়াক না থাকার ফলে ডিজিটাল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। শুধু ফারুয়া ইউনিয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২১টি। তন্মধ্যে বড়থলিতে ৪ টি। সেখানে মোবাইল নেটওর্য়াক না থাকার কারণে তারা  যুগের সাথে তাল মেলাতে পারছেন না। বর্তমানে সব কিছু ডিজিটাল আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, নাগরিক সেবা অনলাইনের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। যাতে প্রত্যেক নাগরিক খুব সহজে ঘরে বসে সেবা পায়। কিন্তু এই দুই ইউনিয়নের জনগণ এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

সরেজমিনে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এই ফারুয়া ইউনিয়ন। প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করছেন। একইভাবে ফারুয়ার দক্ষিণে মায়ানমার ও ভারতের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ৪০০০ জনসংখ্যা রয়েছে বড়তলি ইউনিয়নেও। এখানে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র কৃষির উপর নির্ভরশীল। তবে দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষদের দেখলে মনে হওয়ার কোনো অবকাশ নেই যে এরা বাংলাদেশের জনগণ। এটাতো দুর্গম আর পশ্চাৎপদ এলাকা, অন্য দিকে মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। ফলে দেখা যায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কৃষক তার ফসলি জমির যেকোনো সমস্যায় কৃষি বিশেষজ্ঞ কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ পান না। সেক্ষেত্রে তাকে উপজেলা সদরে আসতে হয়।

দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, মোবাইল ফোন, ইন্টারেনট সেবা এখন পৌ্ছেঁ গেছে ঘরে ঘরে। অথচ কাল্পনিক মনে হলেও বাস্তব সত্য যে ফারুয়া ও বড়থলি এই দুই ইউনিয়নে মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতির সময় সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে। এখানকার শিশুরা এই সেবা (নেটওয়ার্ক) থেকে বঞ্চিত। স্থানীয় অভিভাবকদের দাবী, তাদের সন্তানরা যেন জরুরি নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ এই সুবিধাটি পায়। এছাড়া প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নেই মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা। সারা বাংলাদেশের মানুষ যেখানে ঘরে বসে ডিজিটাল সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে এসব এলাকার ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ জনসাধারণ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

কৃষক / জুমিয়ারা জানান, জুম ও জমিতে উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসব্জি এবং মসলা জাতীয় পণ্য আদা, হলুদ দেশে চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক ও মূল সড়কের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধা না হওয়ায় ঠিকমত ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংরক্ষণ এবং বাজারজাত করা যাচ্ছে না। যার ফলে নার্য্যমূল্য পাচ্ছি না, কোনো কোনো সময় পঁচন ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, সরকার চাইলে যে কোনো মুহূর্তে করতে পারে, এজন্য দরকার সকল প্রশাসনের সদিচ্ছা। অনেক কষ্টের মধ্যে আছি আমরা। এখানে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইলে নেটওয়ার্ক নাই। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি পাওয়া এগুলো সব মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেগুলো আমাদের শিক্ষার্থীরা ঠিক মতো পাইও না, জানেও না। অসুস্থ রোগীদের জন্য ঠিক মতো চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা নাই। অভিজ্ঞ ডাক্তারদের যে পরামর্শ নেব সেই সুযোগও নাই। বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকায় আমরা সরকারের নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তারা জানান, মনে হয় আমরা এদেশের জনগণ নই। সেজন্য সরকার আমাদের দেখতে পারেনা। সরকার চাইলে এটা সমাধান করতে পারেন। এ বিষয়ে নেই কোনো সরকার ও কোনো প্রশাসনের সদিচ্ছা। এজন্য প্রয়োজন উপজেলা ও জেলার সকল প্রশাসন ও পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক জানান, নেটওয়ার্কের যতো ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা আছে তা আমরা পাচ্ছি না। বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কাজগুলো আমাদের বিলাইছড়ি অথবা পার্শ্ববর্তী উপজেলা রাজস্থলী এবং বান্দরবানে রুমা উপজেলায় গিয়ে করতে হয়। যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। আমাদের নেটওয়ার্কের অসুবিধার কারণে এইসব এলাকায় যেতে হচ্ছে।

এলাকার হেডম্যানরা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের মতো উন্নত দেশে পরিণত। দেশে প্রায় জায়গায় সড়ক, নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সুবিধা উন্নতি করা হচ্ছে, করা হচ্ছে না আমাদের ইউনিয়নগুলো। স্বাধীনতার আগ থেকেই এই গ্রামগুলোতে বসবাস করে আসছে মানুষ। সরকার দেখেও না দেখার মতো বেখেয়ালিতে সময়ক্ষেপণ করছে।

ধর্মীয় গুরু/পালক প্রধান রবার্ট বম জানান, উপজেলা ও শহরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় রঙিন আলোতে ঝলমল করে। সেখানে গেলে রঙিন জগতে বসবাস করছি বলে মনে হয়, কিন্তু নিজের জায়গায় আসলে মনে হয় ভিন্ন জগতে বসবাস করছি। আর ফারুয়ার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ঢুকলে টর্চের আলো দিয়ে ঢুকতে হয়। নেটওয়ার্ক তো নাই, নাই বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের কথা না হয় বাদ দিলাম।

ওয়ার্ড মেম্বাররা জানান, মোবাইল নেটওর্য়াক না থাকায় এলাকায় বড় সমস্যা। বন্যা ও মহামারী হলে অনেক সময় সরকারের মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওয়ার্ড গুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু এলাকা মোটর বাইকে যেতে পারলেও বেশির ভাগ এলাকায় যেতে হয় পায়ে হেঁটে। যেকোন মুহূর্তে বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশংকা সবসময় সকলের মধ্যে থাকে। তবুও জনগণের জন্য কাজ করে যেতে হচ্ছে।

বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া থেকে যোগাযোগের পথ বর্তমানে পাশ্বর্বতী উপজেলা রাজস্থলীর সাথে কিছুটা  সুব্যবস্থা হলেও, উন্নতি করা হয়নি ফারুয়ার সাথে উপজেলা সদর পর্যন্ত। স্বাধীনতার পর থেকে সড়ক পথ করা হয়নি ফারুয়া হতে বড়থলি পর্যন্ত রাস্তাও। এখানকার যাতায়াতে ফারুয়া ইউনিয়নের সঙ্গে কিছুটা সড়ক পথ থাকলেও নেই কোনো বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্কের সুবিধা। যার ফলে চরম বিপাকে ফারুয়া ও বড়থলিবাসী।

ফারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ১৯৮৪ সালে ইউনিয়নটি উন্নীত করা হলেও এখনো নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সংযোগ করা হয়নি। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শতভাগ করার জন্য সরকার থেকে নির্দেশনা আসে কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে আমার এই জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনটি সঠিকভাবে করতে পারছিনা। প্রতিবন্ধীভাতা, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচী মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পেমেন্ট করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে এদের ভাতা ঠিক মতো পায় না।

তিনি আরও বলেন, এ ইউনিয়নটি অতি দুর্গম হওয়াতে অন্যান্য ইউনিয়ন থেকে উন্নয়নে পিছিয়ে আছে, মোবাইল ফোনে নেটওর্য়াক না থাকার কারণে সহজে যোগাযোগ করা যায় না। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে ফারুয়া ইউনিয়নের সেবাদানের লক্ষ্যে সরকার যাতে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের টাওয়ার স্থাপন এবং বিদ্যুৎ সুবিধা  সহ সেজন্য ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে জোর দাবী জানিয়েছেন।

বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা জানান, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুর্গম ইউনিয়ন হচ্ছে বড়থলি ইউনিয়ন। ২০১৩ সালে ৪ নভেম্বর ফারুয়ার ৮ ও  ৯নং ওয়ার্ডকে আলাদা করে বড়থলি ইউনিয়নে উন্নিত করা হয়। ইউনিয়নটি উন্নিত হলেও এখনও ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মোবাইলে নেটওয়ার্ক তো দুরের কথা। ইউনিয়নটি বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার কাছাকাছি হওয়ায় বড়থলি সীমান্তে রুমা উপজেলার কাছাকাছি এলাকায় একটি অস্থায়ী কার্যালয়ে অফিস পরিচালনা করছি। হাইস্কুল ১টি রয়েছে, রয়েছে ৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। মোবাইলে নেটওয়ার্ক কথা বাদ দিলাম, উপজেলায় অফিসিয়াল কাজে আসতে হলে আসতে হয় রুমা, বান্দরবান, রাজস্থলী ও কাপ্তাই উপজেলা হয়ে। যা প্রায় ২ দিন সময় লাগে। আর বড়থলি থেকে ফারুয়ার পথে কোনো সড়ক পথ নেই। হেঁটে আসলে প্রায় ১ সপ্তাহ সময় লাগে। বিদ্যুতের কথা বাদ দিলাম। তাই বিদ্যালয় গুলো নেটওয়ার্কের আওতায় এনে দ্রুত জাতীয়করণ করা প্রয়োজন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সুরজিত দত্ত জানান, ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়নে বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক না থাকায় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো ঔষধ সরবরাহ করা খুবই কঠিন হচ্ছে । গর্ভবতী মা এবং শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। রেজিষ্ট্রেশন, টিকা ও মেডিকেল / চিকিৎসা ক্যাম্প সঠিকভাবে পরিচালনায় ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষাকালে বন্যার পরে বিশুদ্ধ পানি না থাকার কারণে ডায়রিয়া, গ্রীষ্মকালে কলেরা সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। এতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে। ইউনিয়ন গুলো দুর্গম হওয়ায় কোনো কোনো সময় ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছার আগেই রোগী মারা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেছেন, দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওর্য়াক পৌছে দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের ই-লার্নিং ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১০০টি বিদ্যালয়ে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে অর্ন্তবর্তী সরকার। এ উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত এক বিপ্লব হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা অনলাইনে শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাসে অংশ নিতে পারবে। ডিজিটাল যুগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে এ এলাকার জনগণ তাই জনজীবনে অতিব গুরুত্বপূর্ণ এই ডিজিটাল সেবা মোবাইল ফোন নেটওর্য়াক, বিদ্যুৎ ও সংযোগ সড়ক পথ চালুর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় এলাকাবাসী।

ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নাচে বরণ, ডিকন ফ্রান্সিস সাধুমণি ত্রিপুরার যাজক অভিষেকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

মথি ত্রিপুরা, রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

পার্বত্য অঞ্চলের ত্রিপুরা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও স্বপ্নপূরণের মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে। ডিকন ফ্রান্সিস সাধুমণি ত্রিপুরার যাজক অভিষেক উপলক্ষে শুরু হয়েছে নানা ধর্মীয় ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নাচ, ফুলের মালা ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়।

এদিন থানচি উপজেলার শান্তিরাজ ক্যাথলিক ধর্মপল্লী থেকে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাঁকে বলিপাড়া ক্যাথলিক মিশনের নিবেদিতা কুমারী মারিয়া ধর্মপল্লীতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নাচ ও ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এ সময় ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহাধর্মপ্রদেশের আর্চবিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদার, সিএসসি, বিভিন্ন ধর্মপ্রদেশের যাজক, সিস্টার ও ব্রাদারগণ, বিভিন্ন এলাকার কর্মরত ধর্ম প্রচারক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিভিন্ন পাড়া থেকে আগত কারবারি, সাধুমণির মা-বাবা, ভাই-বোনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে আগত গণ্যমান্য অতিথি ও ব্যক্তিবর্গকে সুগন্ধি তেল ও পবিত্র পানি দিয়ে পা ধুয়ে-মুছে পবিত্রতা, বিনয় ও সম্মানের প্রতীকী অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরপর পবিত্র আরাধনা, ধর্মীয় শোভাযাত্রা এবং ডিকন ফ্রান্সিস সাধুমণি ত্রিপুরার মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ধর্মযাজক, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা একে একে তাঁর কাছে এসে আশীর্বাদ প্রদান করেন। প্রিয়জনদের ভালোবাসা, আবেগ ও আনন্দে পুরো আয়োজনজুড়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

পরে আর্চবিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদার, সিএসসি সমাপনী বক্তব্য ও আশীর্বাদ প্রদান করেন। এর মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

আগামীকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল ৯টায় ডিকন ফ্রান্সিস সাধুমণি ত্রিপুরার মূল যাজক অভিষেক অনুষ্ঠান শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।

এদিকে সাধুমণি ত্রিপুরার বড় ভাই আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ছোটবেলা থেকেই সাধুমণিকে অনেক প্রতিকূলতা ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে। তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার সময় সাধুমণি ছিলেন অনেক ছোট। নানা কষ্টের মধ্যেও তাঁর এই পর্যায়ে পৌঁছানো পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি, সে জীবনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। সে শুধু নিজের জন্য যাজক হয়নি, পুরো জাতি ও মণ্ডলীর সেবার জন্য ফাদার হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই তার জন্য প্রার্থনা করব, যেন সে মানুষের সেবা ও ধর্মীয় দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারে।

উল্লেখ্য, ডিকন ফ্রান্সিস সাধুমণি ত্রিপুরার এই যাজক অভিষেককে ঘিরে ত্রিপুরা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দ, উৎসাহ ও আবেগের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর এই অভিষেক পার্বত্য অঞ্চলের ত্রিপুরা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অঙ্গনে একটি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কাপ্তাইয়ে ৬০ বননির্ভর পরিবারের মাঝে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের নগদ অর্থ বিতরণ

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি :

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাইয়ে ব্যাঙছড়ি মুসলিম পাড়া ও মারমা পাড়ার বননির্ভর হতদরিদ্র ও আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমে যুক্ত পাহাড়ি-বাঙালি ৬০ জন নারী সদস্যের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় স্থানীয় ব্যাঙছড়ি মারমা পাড়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। ইউএনডিপির সহযোগিতায় এবং গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (GAC)-এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ইইআরডি-সিএইচটি (EERD-CHT) প্রকল্পের সাব-প্রকল্প “জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্প”-এর আওতায় এই নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ​অনুষ্ঠানে বকুল তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ইউএনডিপি প্রতিনিধি চম্পা চাকমা। এ সময় রাঙামাটি জেলার কর্মকর্তা কামনাশীষ খীসা, পাড়ার কার্বারী সুইহলাচিং মারমা, বিসিজি-এর সহ-সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, কাপ্তাই প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রিপন মারমা এবং স্থানীয় থুইসাই মারমাসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের “কাপ্তাই-রাঙামাটি সদর হাতি করিডোর যৌথ বিসিজি”-এর ব্যাঙছড়ি মারমা পাড়া ও মুসলিম পাড়ার ৬০ জন নারী সদস্য এবং স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

অতিথিরা বক্তব্য বলেন, বননির্ভর হতদরিদ্র ও আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত মোট ৬০টি পরিবারকে এই সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ৬ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা নগদ প্রদান করা হয়। প্রাপ্ত এই অর্থ দিয়ে উপকারভোগী নারীরা শাকসবজি চাষাবাদ এবং হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। এই আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে স্থানীয় নারীরা নিজেদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও সুদৃঢ় করতে পারবেন বলে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন অতিথিরা।

রুমার দুর্গম পাহাড়ি পাড়ায় যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবে সেনাবাহিনীর ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

মথি ত্রিপুরা, রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ লাঘব ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়ার সুবিধার্থে ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’ নামে একটি চাঁদের গাড়ি (জিপ) প্রদান করেছে সেনাবাহিনীর রুমা জোন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে মুননুয়াম পাড়া আর্মি ক্যাম্পে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় পাড়ার প্রতিনিধিদের হাতে গাড়িটির চাবি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রুমা জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হাসান সরকার, এসবিপি, পিএসসি (অধিনায়ক, ৩৬ বীর)।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মুননুয়াম পাড়া, আরথাহ পাড়া, বাসাত্লং পাড়া ও হ্যাপিহিল পাড়াসহ আশপাশের দুর্গম জনপদের বাসিন্দারা যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে রুমা থেকে মুননুয়াম পাড়া সড়কে নিয়মিত যানবাহন চলাচল না করায় স্থানীয়দের কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো। অনেক সময় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে এসব প্রয়োজন মেটাতে হতো তাঁদের। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণেও ভোগান্তি বাড়ত।

দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের এসব সমস্যা নিরসন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মুননুয়াম পাড়া পরিদর্শনকালে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় রুমা জোনের উদ্যোগে স্থানীয় জনগণের জন্য ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’ নামে গাড়িটি প্রদান করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গাড়িটি মূলত মুননুয়াম পাড়া, আরথাহ পাড়া, হ্যাপিহিল পাড়া ও বাসাত্লং পাড়ার বাসিন্দাদের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি আশপাশের আরও ১০টি পাড়ার মানুষও প্রয়োজন অনুযায়ী এ পরিবহন সুবিধা নিতে পারবেন। এতে মোট ১৪টি পাড়ার বাসিন্দারা উপকৃত হবেন।

বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমে আসবে। ফলে স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গাড়িটির সুষ্ঠু পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় পাড়ার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির মাধ্যমে গাড়িটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম তদারকি করা হবে, যাতে ১৪টি পাড়ার মানুষ দীর্ঘমেয়াদে এ সুবিধা ভোগ করতে পারেন।

এদিকে, স্থানীয় পাড়াবাসীরা জানান, সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগ তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও দৈনন্দিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাঁদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে। জনকল্যাণমূলক এ উদ্যোগের জন্য তাঁরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রুমা জোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

×