| ৫ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম:

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

ছবি- প্রতিকী

 

ছন্দ সেন চাকমা, চীফ ফটোগ্রাফার ও কলামিস্ট :

​আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি বিশেষ দিন। কিন্তু বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে যে মেঘলা পাহাড়ের সারি, সেখানে নারী দিবস মানে কেবল একটি তারিখ নয়; সেখানে নারী দিবস মানে এক অবিরাম অস্তিত্বের লড়াই। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যে রক্তিম সূর্য ওঠে, সেই সূর্যের প্রথম আলো পড়ে একদল লড়াকু নারীর ঘর্মাক্ত কপালে। তারা আমাদের আদিবাসী জুমিয়া নারী—যাঁরা একদিকে ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে আধুনিক বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। ​

জুমের অর্থনীতি ও জীবনসংগ্রাম ​পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে ‘জুমিয়া’ শব্দটি কেবল একটি পরিচয় নয়, এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের মহাকাব্য। কাক ডাকা ভোরে যখন কুয়াশার চাদর পাহাড়কে ঢেকে রাখে, তখন থেকেই শুরু হয় জুমিয়া নারীদের জীবনযুদ্ধ। পিঠে থুরুং (ঝুড়ি) বেঁধে দুর্গম পাহাড়ের ঢালে তাঁদের যে পদযাত্রা, তা মূলত সচল রাখে পাহাড়ের আদিম ও অকৃত্রিম জুম অর্থনীতিকে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা—সবখানেই নারী। ​কেবল কৃষি কাজই নয়, কোমর তাঁতে নিজের পিনন-হাদি বোনা থেকে শুরু করে সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি তাঁরা সামলান নিপুণ হাতে। তাঁরাই পাহাড়ের বস্তুতন্ত্রের অঘোষিত রক্ষক। কোন লতা ঔষধি, কোন বৃক্ষ পাহাড়কে ধস থেকে রক্ষা করে—এই আদিম জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জুমিয়া নারীরাই বহন করে চলেছেন। অথচ এই কঠোর শ্রমের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে তাঁদের স্বীকৃতির জায়গাটি আজও অনেকখানি ধূসর। ​

খেলার মাঠে পাহাড়ের জয়গান: এক নতুন বিপ্লব ​তবে গত কয়েক বছরে পাহাড়ের এই দৃশ্যপটে যুক্ত হয়েছে এক অভাবনীয় সোনালী অধ্যায়। পাহাড়ের ঢালে যে পা-গুলো একদিন পাথুরে পথ পাড়ি দিত, সেই পা-গুলোই আজ ফুটবল আর ক্রিকেটের সবুজ গালিচায় প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করছে। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বর্তমান যে জোয়ার, তার মূল কারিগর আমাদের পাহাড়ের কন্যারা। ​ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, কৃষ্ণা রানী সরকার, মারিয়া মান্দা বা মনিকা চাকমাদের নাম আজ প্রতিটি বাঙালির ড্রয়িংরুমে পরিচিত। সাফের (SAFF) শিরোপা জয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো—সবখানেই এই আদিবাসী নারীদের অদম্য জেদ কাজ করেছে।

দুর্গম পাহাড়ের জরাজীর্ণ মেঠোপথ থেকে উঠে এসে তাঁরা আজ দেশের ‘পোস্টার গার্ল’। তাঁদের এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করে যে, আদিবাসী নারীরা কেবল শ্রমের কারিগর নন, তাঁরা মেধা আর সাহসেরও আকর। তারা শিখিয়েছেন কীভাবে সীমাবদ্ধতাকে পায়ের জাদুতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হয়। ​অদম্যদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ​আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই শুভক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সব বাবা-মায়েদের প্রতি, যাঁরা দারিদ্র্য আর সামাজিক বাধার দেয়াল টপকে তাঁদের মেয়েদের মাঠে পাঠিয়েছেন। আমরা অভিনন্দন জানাই আমাদের সেই সব আদিবাসী ক্রীড়াবিদদের, যাঁরা নিজেদের রক্ত আর ঘাম দিয়ে প্রমাণ করেছেন—পাহাড় কেবল শান্ত নয়, পাহাড় জানে কীভাবে গর্জে উঠতে হয়। ​পাহাড়ের সেই সব নক্ষত্রদের প্রতি আমাদের স্যালুট! আপনাদের প্রতিটি গোল, প্রতিটি জয় আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আপনারা কেবল গোলবার কাঁপাননি, বরং আমাদের সমাজের সংকীর্ণ মানসিকতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছেন। ​

উপসংহার: স্বীকৃতির দায়বদ্ধতা ​পরিশেষে বলতে চাই, পাহাড়ের নারীদের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন। জুম চাষের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ক্রীড়া ও শিক্ষায় তাঁদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা আজ সময়ের দাবি। জুমিয়া নারীরা দয়া চান না, তাঁরা চান সমমর্যাদা আর শ্রমের উপযুক্ত সম্মান। ​আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—পাহাড়ের সেই সাহসী হাতগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। জুমের ফসল থেকে শুরু করে খেলার মাঠের ট্রফি—সবখানেই যেন আমাদের আদিবাসী বোনদের জয়জয়কার থাকে। পাহাড়ের এই অদম্য কন্যারা ভালো থাকলেই ভালো থাকবে আমাদের বাংলাদেশ। ​পাহাড়ের প্রতিটি লড়াকু নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

​হারুবিল বনবিহারে ৩২তম কঠিন চীবর দান উদযাপিত: পুণ্যার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

 

ছন্দ সেন চাকমা :

​প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ও বৃক্ষের ছায়াতলে ঘেরা পানছড়ির লোগাং নদীর নিকটবর্তী চেমী ইউনিয়নে অবস্থিত হারুবিল বনবিহারে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে ৩২তম কঠিন চীবর দান। সাম্য, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা ও বিশ্বের সকল প্রাণীর হিতসুখ-শান্তি ও মঙ্গলার্থে মহাশ্রাবক মহামৌদগল্যায়ন কর্তৃক প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্যবাহী এই দানোৎসব ঘিরে পুণ্যার্থীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।

​মহাসমারোহে ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা গত ৩ ও ৪ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি: ১৮ ও ১৯ কার্তিক ১৪০০ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিনব্যাপী এই দানোৎসবের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান ধর্মীয় শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে উপস্থিত থেকে পুণ্য দান করেন পরম শ্রদ্ধেয় বনভান্তের শিষ্যসংঘের প্রধান ও রাঙামাটি রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান পরম প্রজ্ঞালংকার মহাথেরো মহোদয়।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে হারুবিল বনবিহার প্রাঙ্গণ। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন:

​স্বাগত বক্তব্য: সাবেক চেয়ারম্যান চন্দ্র দেব চাকমা।
​শ্রদ্ধাঞ্জলি পাঠ করেন রঞ্জিতা চাকমা। দেশক মণ্ডলী, পূর্ণ মিত্র স্থবির, অধ্যক্ষ আদি কল্যাণ ভান্তে, মহামিত্র ভান্তে; ব্রহ্মদণ্ড ভান্তে এবং প্রজ্ঞালংকার ভান্তে।

​অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন, আনন্দ জয় চাকমা চেয়ারম্যান, ২নং চেমী ইউনিয়ন পরিষদ, শান্তিজীবন চাকমা সাবেক চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ, পানছড়ি।

​পুণ্যার্থীদের আত্মিক প্রশান্তি দুই দিনব্যাপী এই মহতী পুণ্যানুষ্ঠানে বুদ্ধ পূজা, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, কঠিন চীবর দান ও প্রদীপ পূজাসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় এবং সকল প্রাণীর সুখ ও মুক্তি তথা নির্বাণ লাভের হেতু প্রার্থনা করার মধ্য দিয়ে এই পবিত্র দানোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

দিঘীনালায় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দুই শিক্ষক দিয়ে চলছে ৫০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

 

রুপম চাকমা, দিঘীনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি :

খাগড়াছড়ি দিঘীনালা উপজেলার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন সহকারী শিক্ষক ও একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঁচটি শ্রেণির প্রায় ৪৮০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠগ্রহণ, পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ছাত্র ছাত্রী ও অবিভাবকদের।

সরেজমিনে বিদ্যালয়ের গেলে ষষ্ঠ শ্রেণী শিক্ষার্থী অপুর্ব বড়ুয়া বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কারনে আমাদের নিয়মিত লেখাপড়া হচ্ছেনা সরকারের কাছে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান।

শিক্ষার্থীর অবিভাবক লিপি দেওয়ান বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করিয়েও তারা প্রত্যাশিত শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। বিদ্যালয়ে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবী পুরন না হলে অবিভাবকদের পক্ষ থেকে ক্লাস বর্জনের আন্দোলনের যাওয়ার কথা জানান।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনুপ কুমার দাশ বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যা ২১টি হলেও বর্তমানে মাত্র দুজন সহকারী শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাঠদান কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এত কম শিক্ষক দিয়ে প্রায় ৪৮০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানান।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র শিকদার বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পড়াশোনায় উৎসাহ বাড়াতে কাপ্তাইয়ে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী প্রদান

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

 

রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি :

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি রিজিয়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও কাপ্তাই ১১ আর ই ব্যাটালিয়নের উদ্যোগে স্থানীয় পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

​বুধবার (৪ নভেম্বর) স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই মানবিক ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।​ অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের হাতে খাতা, কলম, পেন্সিল, রাবার ও জ্যামিতি বক্সসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ তুলে দেওয়া হয়। স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ ও উৎসাহ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতেই মূলত এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা সামগ্রী বিতরণকালে ১১ আর ই ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অধিক মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং শিক্ষার সার্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান করেন।

কাপ্তাই ১১ আর ই ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পড়াশোনার পরিবেশ সুগম করতে এই ধরনের জনকল্যাণমূলক ও মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।

​ছবির ক্যাপশন: কাপ্তাই ১১ আর ই ব্যাটালিয়নের উদ্যোগে স্থানীয় পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

×