শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার অনুরোধ
ঝিনাইগাতির পূর্ব গজারীকুড়ায় হামলার পর সম্প্রীতি মিটিং
প্রিন্স এডওয়ার্ড মাংসাং,
বিশেষ প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল :
শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার পূর্ব গজারীকুড়া গ্রামে আদিবাসীদের ওপর সংঘটিত হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এলাকায় শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রীতি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মিটিংয়ে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (টিডব্লিউএ), ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশ, বাগাছাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং ঝিনাইগাতি থানার অফিসার ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কিংবা কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনোভাবেই একটি সম্পূর্ণ সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ব্যক্তির অপরাধের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানি, ভয়ভীতি বা অযাচিত গ্রেফতারের শিকার না হন, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
মিটিংয়ে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার অনুরোধ জানান। উত্তেজনা কিংবা প্রতিশোধের পথ পরিহার করে আইন ও প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, যেকোনো বিরোধ বা অভিযোগের ন্যায়সংগত সমাধান আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

বিশেষ করে হামলার পর যেসব পরিবারের গরু, ছাগল ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো শনাক্ত করে প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে তাদের হারানো সম্পদ ফিরে পায় এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সভায় আরও বলা হয়, একটি এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সংলাপের মাধ্যমে যেকোনো সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
বক্তারা মনে করেন, ঝিনাইগাতির পূর্ব গজারীকুড়ার মতো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস, বিভাজন কিংবা শত্রুতা তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো এলাকার মানুষ। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপ ও পারস্পরিক যোগাযোগ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এসময় শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

সম্প্রীতি মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের ভিকার জেনারেল মুন্সিনিয়র ফাদার শিমন হাচ্ছা, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (টিডব্লিউএ) কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অরণ্য ই. চিরান, ঝিনাইগাতি থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নূর মোহাম্মদ, ফাদার উইলসন জাম্বিল, সেক্রেটারি জেনারেল যোহন সাংমা, ফাদার বিজন কুবি, ফাদার অশেষ দিও, ফাদার লরেন্স রোজারিও, ফাদার তরুণ বনোয়ারী, সিস্টার নিশা ঘাগ্রা, টিডব্লিউএ শেরপুর সদর চেয়ারম্যান ডেনিশন দুলাল মারাক, ঝিনাইগাতি উপজেলা চেয়ারম্যান মি. নবেশ খক্সী, শ্রীবরদী উপজেলা চেয়ারম্যান মি. লেবানুস ম্রং, অ্যাডভোকেট দীনেশ দারু, মি. প্রদীপ রুরাম এবং বাগাছাস কেন্দ্রীয় সভাপতি মি. অনিক রেমাসহ বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও আদিবাসী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
মিটিংয়ের মূল বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—অপরাধীর বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, কিন্তু কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পদ ফেরত দিতে হবে এবং আদিবাসী-বাঙালি সবাইকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করবে, প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনবে এবং লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে পূর্ব গজারীকুড়ায় আবারও আস্থা, নিরাপত্তা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির পরিবেশ ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশাই সবার।

| ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬













