ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ সময়ের দাবি
ছবি- প্রতিকী
মথি ত্রিপুরা :
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, অবকাঠামো উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের সহায়তা, রাস্তা-ঘাট নির্মাণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। তাই একজন চেয়ারম্যান বা মেম্বার শুধু জনপ্রিয় হলেই যথেষ্ট নয়, তাঁর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সম্ভবত আগামী কয়েক মাস পর আবারও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক জনপ্রতিনিধি আছেন যারা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হলেও প্রশাসনিক কাজ, সরকারি দপ্তরের সাথে যোগাযোগ কিংবা উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না। এর অন্যতম কারণ হলো শিক্ষার অভাব ও দক্ষতার ঘাটতি।
আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য ন্যূনতম এইচএসসি পাস এবং সদস্য (মেম্বার) পদে অন্তত দশম শ্রেণি পাস শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এটি কোনো মানুষকে ছোট করার জন্য নয়; বরং এলাকার উন্নয়ন ও জনগণের স্বার্থে সময়োপযোগী একটি দাবি।
কারণ একজন জনপ্রতিনিধিকে প্রতিনিয়ত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিসে যেতে হয়, কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করতে হয়, এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে হয়। যদি তিনি সঠিকভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে না পারেন, তাহলে এলাকার প্রকৃত সমস্যা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় না। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে কিছু এলাকায় এমন চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মহিলা মেম্বার রয়েছেন যারা রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা ভালোভাবে বলতে পারেন না। এমনকি অনেকে নিজের মাতৃভাষাতেও গুছিয়ে কথা বলতে অক্ষম। ফলে সভা-সেমিনার, উন্নয়ন আলোচনা কিংবা প্রশাসনিক বৈঠকে এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখ ও প্রয়োজনীয় দাবিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন না। এতে এলাকার সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অনেক জনপ্রতিনিধি আছেন যারা নির্বাচিত হওয়ার পর শুধু নামমাত্র দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে কিছু মহিলা মেম্বারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁরা এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি বরাদ্দ বা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। ফলে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ একজন সচেতন ও শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি চাইলে নিজের এলাকায় নতুন প্রকল্প আনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে কাজ করা এবং জনগণের অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
শিক্ষা মানুষকে শুধু বইয়ের জ্ঞান দেয় না; এটি মানুষকে চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী করে তোলে। একজন শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি সহজেই সরকারি নীতিমালা বুঝতে পারেন, প্রকল্পের কাগজপত্র পরিচালনা করতে পারেন এবং জনগণের দাবি যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অনিয়ম কমাতেও শিক্ষার বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের উচিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতার নীতিমালা প্রণয়ন করা। এতে করে ভবিষ্যতে আরও দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হবে।
গ্রামবাংলার উন্নয়ন নির্ভর করে সঠিক নেতৃত্বের ওপর। তাই জনপ্রিয়তার পাশাপাশি যোগ্যতা, শিক্ষা ও দক্ষতাকেও গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। জনগণের কল্যাণে শিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব গড়ে উঠুক—এটাই সবার প্রত্যাশা।




