| ৩১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম:

শুভ জন্মদিন মহান নেতা এমএন লারমা : তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্তর্ভুক্তি মূলক বাংলাদেশ বিনিমার্ণের, তা বাস্তবায়ন হোক

শুভ জন্মদিন মহান নেতা এমএন লারমা : তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্তর্ভুক্তি মূলক বাংলাদেশ বিনিমার্ণের, তা বাস্তবায়ন হোক

 

আজ থেকে ৮৭ বছর আগে ফুরামোন,আলুটিলা, যমচুগ মাঝখানে চেঙ্গি উপত্যকায়, বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলাধীন বুড়িঘাট মৌজার মহাপুরম (মাওরুম) গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ (এমএন) লারমার জন্ম। ডাক নাম মঞ্জু। পিতার নাম- চিত্ত কিশোর চাকমা, মাতার নাম- সুভাষিণী দেওয়ান। স্ত্রীর নাম পঙ্কজিনী চাকমা ১৯৭১ সালে বিবাহ আবদ্ধ হন। এক ছেলে জয়েস লারমা ও এক মেয়ে পারমিতা লারমা। এমএন লারমার এক বড় বোন জ্যোতি প্রভা লারমা,  বড় ভাই শুভেন্দু প্রভাস লারমা, ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। ভাই-বোন, পাহাড়ী জনপদের মরণফাঁদ নামে খ্যাত কাপ্তাই হ্রদের অতল জলরাশিতে সে গ্রামটি তলিয়ে গেছে অনেক আগেই।

এম এন লারমা জন্মগ্রহন করেছিলেন পশ্চাদপদ ও ঘুণেধরা জুম্ম সমাজের সাধারণ একটি পরিবারে; কিন্তু এই পরিবারটি রক্ষণশীল, পরনির্ভরশীল ও সামন্ত নেতৃত্বের বিরোধীতা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার রক্ষায় সাহসী ভূমিকা রাখে, তারা অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও জুম্ম যুবশক্তিকে সুশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ ও প্রচারের আন্দোলন শুরু করে;

এমএন লারমা প্রাথমিক শিক্ষা মহাপ্রুম জুনিয়র হাই স্কুলে, ম্যাট্রিক ১৯৫৮ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি কিন্তু যুবক লারমার গতিশীল চিন্তা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মুক্তির সঙ্গে পার্বত্যবাসী জনগণের মুক্তি একই তারে বাঁধা এ প্রতীতি তার ছিল। তাই ১৯৫৬ সাল থেকে এম এন লারমা ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ করেন। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যয়নের সময় ১৯৫৮ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে আই এ পাস করেন এবং কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব বিলোপের লক্ষ্যে শাসক শ্রেণীর আগ্রাসী উপনিবেশিক তাণ্ডব ও ভ্রান্তনীতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

এ সময় তিনি কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি লিফলেট প্রকাশ করেন। সচেতন ছাত্র-যুবকরা রাতের আঁধারে এই লিফলেট সর্বত্র বিলি করলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। ফলে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নিবর্তনমূলক আইনে সরকার এম এন লারমাকে গ্রেফতার করে; প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর এম এন লারমা ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬৫ সালে জেলে অন্তরীণ অবস্থায় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে সমাজকল্যাণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

১৯৬২ সালে এম এন লারমার নেতৃত্বে রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সে সময় জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজের নিকট ‘গ্রামে চলো’ শ্লোগান তুলে ধরেন। শতাব্দী প্রাচীন শাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা নিদ্রামগ্ন সমাজে ব্যাপক শিক্ষা প্রসার না ঘটালে জুম্ম জনগণকে অধিকার সচেতন করা সম্ভব নয় বলে তিনি ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সাধারণের মাঝে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি। তাঁর সেই যুগান্তকারী আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষিত যুব সমাজের অনেকেই গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। তারা একাধারে শিক্ষকতা করা ও রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

এম এন লারমা নিজেও ১৯৬৬ সালে খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালে বি এড পাস করেন এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনি হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পরে ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাশ করলে তিনি চট্টগ্রাম বার কাউন্সিলে যোগদান করেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু সে সময় বিরাজিত অস্থির ও সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে অনেক পাহাড়ী যুবক ইচ্ছে থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এ ধরনের ঘটনা যে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাতেই হয়েছে এটি ভাববার অবকাশ নেই। দেশের অন্যত্রও হাজার হাজার যুবক-ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি সুযোগ-সুবিধার অভাব ও পরিস্থিতিগত কারণে। রক্তাক্ত কিন্তু সদ্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নিয়ে এম এন লারমার ছিল আকাশ সমান স্বপ্ন ও গভীর ভাবনা। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় তাঁর সেই স্বপ্ন বারবার উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, দেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সকল প্রকারের জাতিগত-শ্রেণীগত নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটাবে। তাঁর বুকভরা আশা ছিল সংবিধানে জাতি-শ্রেণী নির্বিশেষে সকলেরই অধিকার সংরক্ষিত হবে এবং ঔপনিবেশিক অপশাসনের সকল কালাকানুন ও দমন-পীড়ন চির অবসান হবে, বিশেষ করে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক অধীনতা থেকে পাহাড়ী মানুষ পাবে মুক্তির স্বাদ।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আশা করেছিলেন, জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী শক্তির প্রতি জুম্ম জাতির শত বছরের বঞ্চনার বেদনা বুঝবেন। তারই আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি গণ পরিষদে বার বার আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারীরা তাঁর দাবির আসল মর্মার্থ না বুঝতে পেরে এবং এর পেছনে প্রচ্ছন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদ ক্রিয়াশীল আশঙ্কায় এই দাবিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। বাহাত্তরের সংবিধানে উল্লিখিত হয় যে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ জাতি ধর্ম লিঙ্গ জাতিসত্তা নির্বিশেষে ‘বাঙালি’ নামে অভিহিত হবে। কিন্তু লারমার দৃষ্টিতে ‘বাঙালি’ নামে পরিচিত মূলত সমতলবাসী জনগোষ্ঠী ভিন্ন একটি জাতি, যা ‘জুম্ম’ জাতিগোষ্ঠী থেকে নৃতাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র। কাজেই ‘জুম্ম’ জাতি কখনও ‘বাঙালি’ হতে পারে না। পার্বত্যবাসীরা যেমন ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ, তেমনি তাদের রয়েছে আলাদা ভাষা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও পৃথক জীবনাচার। তাই সেদিন তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে বের হয়ে আসেন। বারংবার তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন অনেক মন্ত্রী-নেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্ব-শাসনের কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সব আবেদন-নিবেদন ব্যর্থ হয়ে যায় শাসকবর্গের উগ্র জাতিয়তাবাদী দাম্ভিকতায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭২ সালে ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রতিষ্ঠা করলেন জুম্ম জনগণের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। তিনি ছিলেন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

সংগঠনে তিনি জুম্ম জনগণের প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক অংশকে যুক্ত করেছিলেন। এর অঙ্গসংগঠন পাহাড়ী ছাত্র সমিতি, মহিলা সমিতি, যুব সমিতির মাধ্যমে আপামর জুম্ম জনগণকে তিনি জনসংহতি সমিতির পতাকাতলে সংগঠিত করেন। ১৯৭৩ সালে জনসংহতি সমিতির সভাপতি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলে এম এন লারমা ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে চাথোয়াই রোয়াজা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দু’জনেই বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নসহ দেশের মেহনতি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পক্ষে ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। ১৯৭৪ সালে সরকারের পার্লামেন্টারী প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান করেন। বরাবরই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজেছেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নিলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়মাতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ হয়। এই পরিস্থিতিতেই বাধ্য হয়ে তিনি জুম্ম জনগণকে তাদের সমস্যা সমাধানে এবং নিজেদের আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র তুলে নেবার আহ্বান জানান। শুরু হয়, তাঁর নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন, লক্ষ্য আধিপত্যবাদী বাঙালির আগ্রাসী শক্তি ও তার প্রতি সেনা কর্তৃত্ব থেকে জুম্ম জাতির মুক্তি ও স্বায়ত্তশাসন অর্জন। কিন্তু যুদ্ধ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভোর রাতে ১০নং বিপদসংকেত চলাকালীন ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ে জনসংহতি সমিতির বিভেদপন্থী গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় তিনি খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির গভীর জঙ্গলে এক গোপন আস্তানায় নির্মমভাবে নিহত হন। সেই আক্রমণে তাঁর সঙ্গে আরো আটজন সহযোদ্ধা মারা যান।

এমএন লারমা আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন, তা-হলো আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মানে সংবিধানে আদিবাসীদের জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যগত এবং ভূমির ওপর প্রথাগত অধিকারের স্বীকৃতি। একজন চাকমা বা সাঁওতালের জাতিগত পরিচয় কখনো বাঙালি হতে পারে না- ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর মানবেন্দ্র লারমা তৎকালীন সংসদকে এই ঐতিহাসিক আর নৃবৈজ্ঞানিক সত্যটি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন তাদের সবাইকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ৫৫ বছর পর সংবিধানে সংশোধনে আবারও একই ব্যবস্থাপত্র দেওয়া থাকবে কিনা এখন প্রশ্ন? এখন সময় এসেছে সেই ভুল শোধরানো। কিন্তু সেই সময়ের যে, বাংলাদেশের জনগণ সবাই জাতি হিসেবে বাঙালি হবেন। পাকিস্তান আমলে পশ্চিমারা আমাদের বলতেন পাকিস্তানি জনগণের জাতি হচ্ছে একটিই-মুসলমান জাতি। আমরা তা মানিনি, আমরা বলেছি, আমরা জাতি হিসেবে কখনই মুসলিম না, জাতি হিসেবে আমরা অবশ্যই বাঙালি। সরকার ও সাংসদগণ সংবিধান সংশোধনের সময় জাতি ও জাতীয়তা প্রশ্নে বিশ্বের সমসাময়িক জ্ঞান থেকে বিযুক্ত হয়ে যে কাজ করেছেন তা মুর্খতারই নামান্তর; আর এটাই সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা যে বাঙালি ২৪ বছর পাকিস্তানের জাতিগত/ভাষাগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জাতিগত/ভাষাগত পরিচয় অর্জন করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বাঙালিরাই আদিবাসীদের ওপর জাতিগত/ভাষাগত নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। যে বাঙালি ২৪ বছর পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে গণতন্ত্র অর্জনের জন্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই বাঙালিরাই আদিবাসীদের ওপর সামরিক আধিপত্য বজায় রেখেছে। এক সময়কার নির্যাতিত বাঙালি অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষমতার প্রশ্নে এখন নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এটাই বোধহয় ইতিহাসের বক্রাঘাত।

আমাদের প্রত্যাশা ছিল শাসকগোষ্ঠী সংবিধানে এই সত্য মেনে নেবে যে, বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ এবং এর মধ্য দিয়ে সকল জাতির পরিচয়, অধিকার ও সংস্কৃতিকে স্থান দেবে; এভাবেই রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সবার; কিন্তু দেখি আশার সে রুটিতে লাল পিঁপড়ে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার যে বহুত্ববাদী নীতি বা বৈচিত্র্যের ভেতরে যে সংহতি তাকে নির্লজ্জভাবে পরিহার করে সংবিধানে ৯ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তা বিশিষ্ট বাঙালী জাতি’র মতো বাক্য। বাংলাদেশ কোনো একক ভাষা বা একক জাতির রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও আরো জাতির মানুষ বসবাস করে এবং তারা বাংলায় নয়, তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় কথা বলেন। সংবিধানে এদেশে বসবাসরত অন্য ভাষাভাষীর মানুষের মাতৃভাষাকেও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছে।

সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হলেও অন্য ধর্মগুলোর অস্তিত্ব স্বীকার করেছে কিন্তু দেশের অন্য জাতিসমূহের ভাষার অস্তিত্বের ব্যাপারে সংবিধান শব্দহীন এবং নিশ্চুপ। একুশ আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে। খুবই ভালো খবর; তবে যে বিষয়টি খোলাসা করা দরকার তা-হলো ২১ ফেব্রুয়ারির এই স্বীকৃতি, বাংলা ভাষার কোনো স্বীকৃতি নয়। এই স্বীকৃতি নিজের ভাষার জন্য বাঙালি জাতির ‘লড়াই’ এর স্বীকৃতি। অর্থাৎ ভাষা বা বাংলা ভাষা এখানে স্বীকৃতি পাচ্ছে না বা এতে প্রমাণ হচ্ছে না বাংলা ভাষা সারা পৃথিবীতে ‘বিশেষ’ মর্যাদার কোনো ভাষা: বরং এতে স্বীকৃতি পেয়েছে ভাষার জন্য বাঙালি জাতির লড়াই। বাঙালি জাতি এর মধ্য দিয়ে ‘মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াকু মানুষ’ হিসেবে পৃথিবীর বুকে ‘বিশেষ’ মর্যাদা পাচ্ছে। আর ভাষার প্রশ্নে এই স্বীকৃতির সত্যিকারের অনুবাদ হলো-পৃথিবীর সব মাতৃভাষাগুলোর রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া। ভাষার সঙ্গে ভাত বা জীবিকার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ, তাই আদিবাসীদের ভাষায় শিক্ষাদান বা তাদের ভাষা বিকাশে রাষ্ট্রের করণীয় নির্ধারণ আজ জরুরি।

বাংলাদেশে বসবাসরত ৫৬টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকগণ নিজ নিজ ভাষায় কথা বলেন; এসব ভাষার কোনটির কী অবস্থা তা জানার জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে দ্রুত ভাষা জরিপের কাজটি সম্পন্ন করা উচিত, তাদের ভাষা বিকাশের জন্য আদিবাসী ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আমরা হয়তো এই সত্যটিই জানিনা যে, বাংলার পরে বাংলাদেশে দ্বিতীয় কথ্য ভাষা হচ্ছে সাঁওতাল। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী বাস করেন এবং তাদের কাছে সবচেয়ে অবমাননাকর শব্দ হচ্ছে ‘উপজাতি’; আদিবাসীদের কাছে এটি ‘বাতিল’, ‘পশ্চাৎপদ’ ও ‘পরিত্যাজ্য’ একটি শব্দ। বর্তমান সংবিধানে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে তাদেরেকে অপমান করা হয়েছে; উপরন্তু বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালি ছাড়াও অপরাপর জাতির পরিচয়কে তুলে ধরতে যেয়ে একইসঙ্গে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী, সম্প্রদায় ইত্যাদি বিভিন্ন অভিধা ব্যবহার করা হয়েছে যা নিতান্তই হাস্যকর এবং এগুলোর স্পষ্ট কোনো সংজ্ঞায়ন সংবিধানে নেই। এর মধ্য দিয়ে আদিবাসী পরিচয় নির্মাণে পবিত্র সংবিধানে এক ধরনের দ্বিধা আর তালগোল পাকানো হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে আদিবাসীদের পরিচয়, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও অধিকারের স্বীকৃতি আছে। যেমন আমেরিকা, কানাডা, বলিভিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা প্রভৃতি ‘দেশে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি শুধু নয়, আদিবাসী ভূমি অধিকার ও টেরিটরির মালিকানা পর্যন্ত স্বীকৃতি পেয়েছে। কোনো কোনো দেশে উচ্চতর আদালতের রায় ও নির্দেশনা আছে আদিবাসী অধিকার রক্ষার জন্য। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে আদিবাসীদের আইনগত অধিকার ও চুক্তি রয়েছে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের মধ্যে। মালয়েশিয়ার আদিবাসী ‘ওরাং আসলি’দের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইন হয়েছিল ১৯৫৪ সালে ‘অ্যাবরিজিনাল পিপলস্ এ্যাক্ট’ নামে। এমনকি মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট আদিবাসীদের পূর্বপুরুষের অধিকৃত ভূমি রক্ষার জন্য রায় দিয়েছিল ২০০২ সালে। ফিলিপাইনে সাংবিধানিকভাবে আদিবাসীরা স্বীকৃত এবং ইনডিজিনাস পিপলস্ রাইটস অ্যাক্ট আছে তাদের। তাছাড়া আদিবাসী বিষয়ক জাতীয় কমিশন আছে ফিলিপাইনে। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও রাশিয়াতে আদিবাসীদের নিজস্ব পার্লামেন্ট আছে। গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের উপনিবেশ হলেও সেখানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি আছে। আফ্রিকার অনেক দেশে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও বৈচিত্রের স্বীকৃতি আছে। কোথাও কোথাও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। এশিয়ার মধ্যে কম্বোডিয়া, ভারত, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, নেপাল, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, লাওস প্রভৃতি দেশে আদিবাসীরা হয় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত অথবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন ও পলিসি দ্বারা স্বীকৃত। ইন্দোনেশিয়ায় তৃতীয়বার সংবিধান সংশোধনের সময় সাংবিধানিকভাবে আর্টিক্যাল ১৮ আদিবাসীদের অস্তিত্বকে সম্মান প্রদর্শন শুধু করেনি, তাদের প্রথাগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। (সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স)।

বাংলাদেশে হাজং, কোচ, বানাই, মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, উঁরাও, মুন্ডা, খাসিয়া, মণিপুরী, খুমি, খিয়াং, লুসাই, বম, ম্রো ও রাজবংশীসহ বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করেন। তাঁরা তাঁদের স্বকীয়তা, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য দিয়ে আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন। ভুলে গেলে ভুল হবে যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ সকল আদিবাসীদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবদান। নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে আদিবাসী জনগণ যাতে সকলের মত সমান মর্যাদা ভোগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আমরা মনে করেছিলাম, ৫৪/৫৫ বছরে ভূ-রাজনীতির গতি প্রকৃতি যেমন পাল্টেছে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, মন-রুচিও অনেক অনেক পাল্টেছে, তাই এখন যে সংবিধান রচিত হবে সংবিধান সংশোধন হবে, তা কেবল ধর্ম নিরপেক্ষ হলেই চলবে না, একইসঙ্গে ভাষা নিরপেক্ষ, জাতি নিরপেক্ষ ও লিঙ্গ নিরপেক্ষ হতে হবে। ভুলে গেলে ভুল হবে যে, বাঙালির একক জাতীয়তাবাদের দেমাগ ইতোপূর্বে রাষ্ট্রীয় শান্তির ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যাই কেবল পয়দা করেছে, কোনো সমাধান বদলাতে পারেনি। শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এরকম ধারণা কাজ করে যে একটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলতে না পারলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার হয় না। আমরা মনে করি একক জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য একটি ভুল প্রেমিজ; বরং একটি দেশের জনবিন্যাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও কৃষ্টির বহুমুখী বিচিত্র রূপই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে; এটিই বৈচিত্রের ঐকতান বা বহুত্ববাদ বিউটি অব ডেমোক্রেসি। একক জাতিসুলভ দাম্ভিকতা বাদ দিয়ে দ্রুত এই সত্য বুঝতে পারলে রাষ্ট্রের জন্য বরং ভালো যে, বাংলাদেশ কোনো এক জাতি এক ভাষা আর এক ধর্মের রাষ্ট্র নয়; এটি অবশ্যই একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের রাষ্ট্র: সংবিধানেও এর ইঙ্গিত আছে কারণ সংবিধানে দেশের নাম পিপলস রিপাবলিক বলা হয়েছে, বেঙ্গলি রিপাবলিক বলা হয়নি; আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবি থেকে আমরা তাই এক চুলও সরে আসতে পারি না। খুবই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন যে, বিচ্ছিন্নতবাদী আসলে কারা? যারা সংবিধানের ভেতর তাদের যথাযথ স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে তারা? নাকি যারা এই স্বীকৃতি না দিয়ে তাদেরকে দূরে ঠেলছে তারা? আমরা মনে করি সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, আমরা চাইলে আবারো একে সংশোধন করতে পারি, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীও তাই বলেছেন। অন্তর্ভুক্তিমুলক বাংলাদেশ নিমার্ণে এবং আমরা সবাই বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে সেই আশায় জাতীয়তা পরিচয়ে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিসমূহ আবারো তুলে ধরছি:

দ্বিধা দোলাচাল আর অস্পষ্টতার কুয়াশা সরিয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে বসবাসরত ৫৬টির অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্রপূর্ণ দেশ’- এই বাক্যের সংযোজন করা হোক।

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিধিসহ অপরাপর সাম্প্রদায়িক শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদসমূহ সংশোধন করে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংবিধানের সংযোজন করা হোক- ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি বিশেষ শাসিত আদিবাসী অঞ্চলের মর্যাদা পাবে।’

তিন পার্বত্য জেলার সংসদীয় আসনসমূহসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদের আসন ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হোক। আইএলও-এর ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশন এবং ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। সাংবিধানিকভাবে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।

ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতামুখী অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে বলতে চাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার জন্য এবং আদিবাসীদের সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিকে আবারো নতুন করে ভাবুন। সংবিধানের ত্রুটিপূর্ণ সংশোধনের প্রতিক্রিয়া আদিবাসীরা দেখাতে শুরু করেছেন, গণমাধ্যমে আমরা তার প্রতিফলন দেখছি। ৩০ লক্ষ মানুষের মনে যে ক্ষোভ আর হতাশা সঞ্চারিত হচ্ছে, দ্রুত তা আমলে না নিলে এখান থেকে অতীতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে, যা আমরা কেউই চাইনা। আমারা এখনও মনে করি বাংলাদেশ একটি বহু জাতির সম্মানজনক অংশীদারিত্বের রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বপ্নকে ধারণ করতে সক্ষম হবে।

আমরা চাই দেশে বসবাসকারী সকল জাতি সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন করে রচিত হোক আগামীর সংবিধান। এমএন লারমা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন যে কথা বলেছিলেন সংসদে আমাদের দেশে সকল নাগরিকদের সম-মযর্দার, সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা তার ব্যবস্থা যদি বর্তমান সরকার ধারণ করে সকলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

 

লেখক :

ইন্টু মনি তালুকদার,

সাধারণ সম্পাদক,

এমএন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম,

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল।

কাউখালীতে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয়, তিন কলেজে পাসের হার ১০ শতাংশের নিচে

শুভ জন্মদিন মহান নেতা এমএন লারমা : তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্তর্ভুক্তি মূলক বাংলাদেশ বিনিমার্ণের, তা বাস্তবায়ন হোক

নিজস্ব প্রতিবেদক | কাউখালী, রাঙামাটি

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা দিয়েছে চরম বিপর্যয়। উপজেলার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৪০ জন। সে হিসাবে উপজেলার সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলাফলের এমন হতাশাজনক চিত্রে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল অনুযায়ী, কাউখালী সরকারি কলেজ থেকে ৩৩২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ৩৪ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে, ঘাগড়া কলেজ থেকে ৬৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ৬ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

এছাড়া শ্রীজোনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার শূন্য শতাংশ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, উপজেলার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি।

শিক্ষার মান, পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ফলাফলের এই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, ফলাফলের এমন বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যথায় আগামী দিনগুলোতে কাউখালী উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে।

বিলাইছড়ি কলেজে পাসের হার ৪৫.১২ শতাংশ, জিপিএ- ৪ পেয়েছেন ২ জন

শুভ জন্মদিন মহান নেতা এমএন লারমা : তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্তর্ভুক্তি মূলক বাংলাদেশ বিনিমার্ণের, তা বাস্তবায়ন হোক

 

সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বিলাইছড়ি (রাঙামাটি) প্রতিনিধি:

রাঙামাটির বিলাইছড়ি কলেজে এবারের পরীক্ষায় পাসের হার ৪৫.১২ শতাংশ। ৩১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১৪ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ১৭ জন। তবে কলেজ থেকে কেউ জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি। অন্যদিকে, দুই শিক্ষার্থী জিপিএ-৪-এর বেশি নম্বর পেয়ে ভালো ফলাফল করেছেন।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রকাশিত ফলাফল থেকে এ তথ্য জানা যায়। কলেজের প্রভাষক অমৃত চাকমা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, মোট ৩১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৪ জন পাস করেছেন। তাঁদের মধ্যে সত্য বিকাশ তঞ্চঙ্গ্যা জিপিএ-৪.৫৮ এবং মেনাংপুরী তঞ্চঙ্গ্যা জিপিএ-৪.২৫ অর্জন করেছেন। কলেজের সার্বিক ফলাফলে জিপিএ-৫ না থাকলেও দুই শিক্ষার্থীর এ অর্জন আশাব্যঞ্জক বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পালবার লিং সেন্টার শিশুসদনের শিক্ষার্থী কোশিক চাকমার জিপিএ-৫ অর্জন, উজ্জ্বল করল মা-বাবার মুখ

শুভ জন্মদিন মহান নেতা এমএন লারমা : তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্তর্ভুক্তি মূলক বাংলাদেশ বিনিমার্ণের, তা বাস্তবায়ন হোক

 

সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা,

বিলাইছড়ি (রাঙামাটি) প্রতিনিধি:

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় রাঙামাটির কর্ণফুলী সরকারি কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ (এ+) অর্জন করেছে কোশিক চাকমা। তার এ সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও পালবার লিং সেন্টার শিশুসদনের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।

কোশিক চাকমার পিতা প্রয়াত মিশন চাকমা এবং মাতা ননাবি চাকমা। তার গ্রামের বাড়ি রাঙামাটি জেলার জুরাছড়ি উপজেলার জামেকছড়ি গ্রামে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে সে বিলাইছড়ি উপজেলায়  পালবার লিং সেন্টার শিশুসদন ( অনাথ আশ্রম) থেকে লেখাপড়া ও বেড়ে উঠেছে।

নিজের এ সাফল্যে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কোশিক জানায়, তার জীবনের এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে পালবার লিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক পরম শ্রদ্ধেয় ভদন্ত দেবতিষ্য ভিক্ষুর। তাঁর ভালোবাসা, আশীর্বাদ, অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

এ ছাড়া তার বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতাকারী সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সে।

কোশিক জানায়, পালবার লিং সেন্টার শিশুসদন শুধু তার বেড়ে ওঠার স্থান নয়, এটি তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই সে শিক্ষা, ভালোবাসা, শৃঙ্খলা ও সুন্দরভাবে জীবন গড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে।

তার স্বপ্ন, ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠান তাকে আজকের অবস্থানে আসতে সহযোগিতা করেছে, সেই পালবার লিং সেন্টার শিশুসদনের উন্নয়নে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখা। একই সঙ্গে তার মতো অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে চায় সে।

কোশিকের ভাষায়, জিপিএ-৫ শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি তার জীবনের নতুন স্বপ্ন, আশা ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

ভবিষ্যতে আরও উচ্চশিক্ষা অর্জন করে একজন ভালো মানুষ হওয়ার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে সবার আশীর্বাদ ও দোয়া কামনা করেছে কোশিক চাকমা।

×