৭০ লাখ টাকার হিসাব নেই, সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ; বাঙ্গালহালিয়া সিএনজি সমিতির কার্যালয়ে তালা
সাত বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবি সদস্যদের, নিবন্ধন বাতিলের আশঙ্কা
উচ্চপ্রু মারমা :
রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া অটো রিকশা চালক সমবায় সমিতির (সিএনজি সমবায় সমিতি) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে সমিতির আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ না করা, সদস্যদের সঞ্চয়ের অর্থের সঠিক হিসাব না পাওয়া এবং সমিতি পরিচালনায় নানা অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন সাধারণ সদস্যরা। একই সঙ্গে সমিতির নিবন্ধন বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া এলাকায় সমিতির কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ সদস্যরা। এ সময় তাঁরা সমিতির আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, সদস্যদের জমাকৃত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
সমিতির সাধারণ সদস্যদের অভিযোগ, ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সমিতির কোনো পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। দীর্ঘ সাত বছর ধরে সদস্যদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে টাকা সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে সদস্যদের ব্যক্তিগত সঞ্চয়, দুর্ঘটনাকালীন সহায়তা তহবিল এবং মৃত্যুকালীন ফান্ডের অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
সদস্যদের দাবি, এসব খাতসহ সমিতির বিভিন্ন তহবিলে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ টাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে হিসাব চাইতে গেলেও তাঁরা সন্তোষজনক কোনো জবাব পাননি। ফলে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, সমিতির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকায় সদস্যদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বিক্ষুব্ধ সদস্যরা জানান, একটি সমবায় সমিতি গড়ে ওঠে সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সঞ্চয় এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাঙ্গালহালিয়া অটো রিকশা চালক সমবায় সমিতিতে দীর্ঘদিন ধরে সদস্যদের মতামত ও স্বার্থ উপেক্ষা করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। সমিতির আয়-ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে নানা ধরনের টালবাহানা করা হয়। এতে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাঁরা কার্যালয়ে তালা লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের ইচ্ছামতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সদস্যদের জমাকৃত অর্থের সঠিক হিসাব না দেওয়ার পাশাপাশি সমিতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ সদস্যদের অবহিত করা হচ্ছে না। সমিতির আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় এখন সমিতির অস্তিত্ব নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, সমিতির আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও পরিচালনাগত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা সমবায় কার্যালয় থেকে সমিতির নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে জেলা সমবায় কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সদস্যদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের শ্রম ও সঞ্চয়ের অর্থ জমা দিয়ে যে সমিতিকে তাঁরা নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তার জায়গা হিসেবে গড়ে তুলেছেন, সেই সমিতির নিবন্ধন বাতিল হলে তাঁদের জমাকৃত অর্থের কী হবে?
সদস্যদের ভাষ্য, সমিতির নিবন্ধন বাতিল হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাই তৈরি হবে না, বরং এর সঙ্গে জড়িত অসংখ্য অটোরিকশা চালকের সঞ্চয়, আর্থিক স্বার্থ ও ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাই নিবন্ধন বাতিলের আগে সমিতির আর্থিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সদস্যদের অর্থের হিসাব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেওয়া সদস্যরা বলেন, ‘আমরা কেউ বড় ব্যবসায়ী নই। দিনভর অটোরিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করি, তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে হয়। সেই উপার্জন থেকে কষ্ট করে কিছু টাকা সমিতিতে জমা দিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জমা টাকার কোনো সঠিক হিসাব পাচ্ছি না। সাত বছর ধরে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। আমাদের টাকা কোথায় গেল, কোন খাতে ব্যয় হলো, তা জানতে চাই।’
তাঁরা আরও বলেন, ‘সমিতি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ সদস্যদের অর্থ ও শ্রমে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রত্যেক সদস্যের অধিকার রয়েছে হিসাব জানার। আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না। আমরা শুধু আমাদের কষ্টার্জিত অর্থের হিসাব চাই। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সদস্যরা জানান, সমিতির আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, সদস্যদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কার্যালয়ের তালা খুলবেন না। তাঁদের দাবি, সমিতির বিগত সাত বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করে সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও মৃত্যুকালীন তহবিলের অর্থের প্রকৃত অবস্থাও প্রকাশ করতে হবে।
এ বিষয়ে বাঙ্গালহালিয়া অটো রিকশা চালক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক লিটন দে বলেন, ‘আমি শুনেছি সদস্যরা সমিতির কার্যালয়ে তালা লাগিয়েছেন। আমি তখন বান্দরবানে ছিলাম। বাঙ্গালহালিয়ায় ফিরে বিষয়টি বিস্তারিত জানাব।’
সমিতির প্রায় ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন।
এদিকে, সমিতির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় অটোরিকশা চালক ও সমিতির সদস্যদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দীর্ঘদিনের এই আর্থিক বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান না হলে সমিতির কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণ সদস্যদের দাবি, সমিতির ব্যাংক হিসাব, আয়-ব্যয়ের খাতা, অডিট রিপোর্ট, সদস্যদের সঞ্চয়ের রেকর্ড এবং দুর্ঘটনা ও মৃত্যুকালীন ফান্ডের আর্থিক।

| ৩১ অক্টোবর ২০২৬















