সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা,
বিলাইছড়ি (রাঙামাটি) প্রতিনিধি:
প্রয়াণের প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও ষষ্ঠ বৌদ্ধ সংগীতিকারক হিসেবে পরিচিত রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জন্মস্থান রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার কুতুবদিয়া গ্রামে তাঁর কোনো ভাস্কর্য নির্মিত হয়নি। এতে স্থানীয় রাইংখ্যং বৌদ্ধ সমাজ ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বৌদ্ধ ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজ সংস্কারে অসামান্য অবদান রাখা এই মহান সংঘনায়কের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রয়োজন পার্বত্য ভিক্ষু সংঘেরও। তাঁর জন্মস্থানে একটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন, আদর্শ ও অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
জানা যায়, ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে ৯৫ বছর বয়সে মহাপ্রয়াণ ঘটে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর। ৪ থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশি-বিদেশি বৌদ্ধ পণ্ডিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
তাঁর প্রয়াণের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও জন্মস্থান কুতুবদিয়ায় স্মৃতিরক্ষার্থে কোনো ভাস্কর্য নির্মিত হয়নি। অথচ তাঁর নাম ও আদর্শকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে শিশু সদন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবস পালন করা হয়। পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি :
স্থানীয়দের দাবি, কুতুবদিয়া গ্রামে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জন্মস্থান কিংবা কুতুবদিয়া বৌদ্ধবিহারের পাশে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার একটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য নির্মাণ করা হোক। এতে রাইংখ্যং নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষ দূর থেকেও ভাস্কর্যটি দেখতে পারবেন। তাঁদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও স্থানীয় জনগণের একার পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়।
তাঁরা আরও বলেন, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতাও দিয়ে থাকেন। কিন্তু রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জন্মস্থান কুতুবদিয়া বৌদ্ধবিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিহারে এখনো স্থায়ী দেশনালয় নেই। প্রতিবছর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় বাঁশের সাঁকো তৈরি করতে হয়। এমন একজন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জন্মস্থানের অবকাঠামোগত অবস্থা ও স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
যে অবদানে স্মরণীয় রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো :
রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমাজের ধর্মীয় জাগরণ, শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক সংস্কারের ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম। তাঁর জন্মনাম ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা। ১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর বিলাইছড়ি উপজেলার কুতুবদিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রুদ্রচিং তঞ্চঙ্গ্যা এবং মাতা পুণ্যগীলা ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যা।
শৈশব থেকেই তিনি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী জীবনে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার-প্রসার, বৌদ্ধ শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা, অনুবাদ কর্ম, সমাজ সংস্কার এবং পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার আলো বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন এবং নিজ জাতির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁর কর্মময় জীবন, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা তাঁকে দেশ-বিদেশের বৌদ্ধ সমাজে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
প্রশাসনের জরুরি উদ্যোগ কামনা :
বৌদ্ধ সমাজ ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর স্মৃতি সংরক্ষণ শুধু একটি ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয় নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ধর্মীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণেরও অংশ।

তাই তাঁর জন্মস্থানে ভাস্কর্য নির্মাণ এবং কুতুবদিয়া বৌদ্ধ বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের জরুরি উদ্যোগ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জন্মস্থান কুতুবদিয়া একদিন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠবে।