ঐতিহ্যবাহী সূর্য মেলায় অনিয়মের ছায়া, প্রশাসনের নীরবতায় বাড়ছে ক্ষোভ
উচ্চপ্রু মারমা, রাজস্থলী প্রতিনিধি :
প্রতিবছরের ন্যায় রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার ৩ নং বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের বাঙ্গালহালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সূর্য মেলা। রোববার মেলার প্রথম দিনেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। মেলাকে কেন্দ্র করে বসেছে রঙবেরঙের খেলনা, মিষ্টি, হস্তশিল্প ও মৌসুমি পণ্যের শতাধিক দোকান।
তবে উৎসবের এই আমেজের আড়ালেই চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি এমন অভিযোগ তুলেছেন মেলায় আগত ক্ষুদ্র ও মৌসুমি দোকানিরা। তাদের দাবি, মেলা কমিটির নাম ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী মহল দোকানপ্রতি সর্বনিম্ন ২ হাজার থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে।
অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মেলায় দোকানের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও চাঁদার পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মেলায় দোকান বসাতে গেলেই একাধিকবার টাকা দিতে হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সরেজমিনে রোববার দুপুরে মেলা এলাকায় গিয়ে দোকানি ও সনাতনী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলাকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়ভাবে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত রয়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার রাজাহাট থেকে আগত এক বৃদ্ধা দোকানি চোখে পানি নিয়ে বলেন— সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল কুম্ভ আর সূর্য মেলায় এসে মাল বিক্রি করবো। কষ্ট করে মালামাল নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখি দোকান বসাতে গেলেই টাকা, আবার টাকা। তনয় নামের এক ব্যক্তি জোর করে চাঁদা নিয়েছে। টাকা না দিলে দোকান তুলতে বলেছে। এটা কি উৎসব, না জুলুম?”
রাজস্থলী ইসলামপুর এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান,,একদিনের জন্য পপকর্নের ছোট দোকান বসাতে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে খারাপ ব্যবহার করেছে। বাধ্য হয়েই দিতে হয়েছে। এত টাকা দিলে লাভ কীভাবে করবো? তাই ক্রেতার কাছেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”
আরেক দোকানি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—আমরা এখানে মাল বিক্রি করি, কেউ কেউ পূজা-অর্চনার কাজও করেন। কিন্তু কমিটির নাম করে যা পারে তাই আদায় করছে। এখানে অন্তত আড়াই’শ দোকানি এভাবে চাঁদা দিচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা আদায়ের বিপরীতে দেওয়া রসিদে কোনো টাকার অংক উল্লেখ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সাদা বা ব্যালেন্স রসিদ ব্যবহার করে টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা প্রশ্ন তুলেছে মেলার স্বচ্ছতা নিয়ে।

এ বিষয়ে মেলা কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন—আমরা কোনো অতিরিক্ত টাকা নেইনি। দোকানিরা স্বেচ্ছায় মেলার খরচের জন্য সহযোগিতা করে। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
বাঙ্গালহালিয়া বাজার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা জানান— দোকানিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত চাঁদাবাজির কথা আমরা শুনেছি। এভাবে চলতে থাকলে মেলার সুনাম নষ্ট হবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”
এ বিষয়ে রাজস্থলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার বলেন— মেলা কমিটি সহযোগিতার জন্য আবেদন করেছে, সেটি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে ইচ্ছামতো চাঁদাবাজির বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব মানুষের আনন্দ ও মিলনের প্রতীক। কিন্তু সেই উৎসব যদি চাঁদাবাজি ও হয়রানির মাধ্যমে কলুষিত হয়, তবে তা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। সূর্য মেলার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।





