রাজস্থলী ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অব্যবস্থাপনা রোগী সেবা ও নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ দায় স্বীকার করলেন – – – – স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা
বিশেষ প্রতিবেদক, রাঙামাটি :
রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের কর্মস্থলে অনিয়মিত উপস্থিতি, জনবলসংকট, রোগীবাহী গাড়ির চালকের দায়িত্বহীনতা, ওষুধ সরবরাহ নিয়ে রোগীরা অভিযোগ এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সহ ভূয়া বিল ভাউচার দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বহুদিন ধরে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।বিগত দিনে হাসপাতালটি ১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নিত করার পর আরো দুর্নীতি অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার বেড়ে গেছে।
৫০ শয্যার এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রোগীর স্বজনদের দাবি, চিকিৎসক ও নার্সদের ডাকলেও অনেক সময় সাড়া পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে তাঁদের। অন্যদিকে, জরুরি রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ বা চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হলে রোগীবাহী গাড়ির চালককে সময়মতো পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি গত বৃহস্পতিবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে চিকিৎসাসেবার মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। এমন কি জানা গেছে, হাসপাতালে নাকি বড় বাবু নামক এক ব্যক্তি আছেন। তার ইশারায় ও ক্যাশিয়ারের ইশারায় নাকি হাসপাতাল পরিচালিত হয়। এখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কোন ভূমিকা নাই বলে অভিযোগে উঠে এসেছে। আবার ঐ দুই ব্যক্তি দীর্ঘ ২৫/৩০ বছর এক জায়গাই চাকরীর সুবিধার্থে বড় বড় দালান কোটা ঘর বেঁধে রয়েছে। হঠাৎ করে হলো আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। গত কয়েক দিন আগে হাসপাতালের চিত্র দেখা যায়, নামে বেনামে টেন্ডার ও আপ্যায়নের ভূয়াবিল দিয়ে ট্রেজারী হতে টাকা উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়। ভুয়া বিল ভাউচার ও অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা হলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা, নওশাদ খান সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে টাকা উত্তেলন করা হয়েছে। যাহা নিয়মবহির্ভুত।
জানা যায়, হাসপাতালের রোগীর খাবার হাসপাতালে রান্না করে পরিবেশন করার কথা ঠিকাদার। কিন্তু ঠিকাদার না করে সাফ ঠিকাদারের মাধ্যমে বাহির থেকে রান্না করে রোগীদের খাবার দেয়া হচ্ছে। এতে খাবার ও নোংরা পরিবেশে বিতরণ করা হয় খাবার। ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। হাসপাতাল প্রতিষ্টিত হওয়ার পর খাবারের ঠিকাদার কে কেউ দেখেনি বলে জানা গেছে। ঠিকাদার শুধু বড় বাবুর ও ক্যাশিয়ারের যোগ সাজসে খাবারের বিল উত্তোলন করে দায়সারা ভাবে গা ঢাকা দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মচারী নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। যেমন ডেন্টাল বিভাগের ডাক্তার, তারা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কোন রোগী গেলে তাদের কে বলেন ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা নিতে, না হয় হোয়ার্টসপে চিকিৎসা পত্র লিখেনিতে।
অপর দিকে সাংবাদিকদের সরেজমিন পরিদর্শনের সময় হাসপাতাল ত্যাগ করার পর্যায়ে কয়েকজন চিকিৎসককে হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তবে তাঁদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, দায়িত্বসূচি ও উপস্থিতির রেজিস্টার যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় অনুপস্থিতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপর দিকে, হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, তিনি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন হাসপাতালে আসেন এবং কোনো কোনো দিন সকাল ১১টার দিকে চলে যান। সে নাকি তার বাড়ী চট্রগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়ার রাজার হাট বাজারে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সেন্টার খুলে ব্যবসা করছেন। সরকারি চাকরী ফাঁকি দিয়ে সেখানে প্রতিদিন চেম্বারে রোগী দেখেন। তার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন বলেন, আমি মৌখিক ভাবে কর্তৃপক্ষের নিকট হতে ছুটি নিয়ে থাকি। নিয়মিত কর্স্থলে উপস্থিত থাকি।
অপর দিকে রোগীরা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদের মোমবাতির উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আমরা জানি হাসপাতালে জেনারেটর আছে, তারা সেটা ব্যবহার করে না। অথচ সরকার প্রতিবছর হাসপাতালের জেনারেটর চালু রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ প্রদান করেন। ঐ টাকা গুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নয়-ছয় করে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালে কাপড় ধোলায়, ডেলিভারী রোগীর নোংরা কাপড় চোপর ধোলাই করার যে পরিমান বরাদ্ধ আসে। সে গুলো নাকি তারা পকেটবারী করে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জসিম উদ্দিনকে কয়েকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি নোটিশের সু নিদিষ্ট জবাব দিতে পারেনি। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন প্রশ্ন করা হলে ডা, নওশাদ খান কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেন নি।
অপর দিকে প্রায় সময় রোগীবাহী গাড়ির চালক নিয়ে ক্ষোভ এলাকাবাসীর। হাসপাতালের রোগীবাহী গাড়ির চালকের দায়িত্ব পালন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চালক নিয়মিত মদ্যপান করে হাসপাতালে আসেন। জরুরি রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হলে অনেক সময় তাঁকে পাওয়া যায় না। ফলে রোগী পরিবহন নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এমন কি তার আচরণে এলাকাবাসী ক্ষুদ্ধ। রাজস্থলী হাসপাতালের কতিপয় ষ্টাপদের দাপট, অনিয়ম ও দুর্নীতির এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খান তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট সাংবাদিক সম্মুখে কোনো জবাব দিতে পারেননি বলে সরেজমিন পরিদর্শনে উপস্থিত সাংবাদিক কে জানান।
এলাকাবাসীরা জানান, রোগীবাহী গাড়ির চালককে অন্যত্র বদলি করে তাঁর স্থলে দায়িত্বশীল চালক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা

| ২৩ অক্টোবর ২০২৬








