মরা গাছের বুকে ‘দেবতার উপহার’: আদিবাসী ঐতিহ্যে মাশরুমই অমৃত
ছন্দ সেন চকমা, বিশেষ প্রতিবেদক :
রাঙামাটি, বিলাইছড়ি উপজেলা বটতলী মোহন পাড়া সরেজমিন বিশেষ ফিচার : একটি মরা গাছের গোড়ায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো সাদা বুনো মাশরুমের ঝাড়। চারপাশের ঝরা পাতার স্তূপ প্রমাণ দেয় এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। গভীর অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। মে মাসের এই প্রথম বৃষ্টি নামলেই পাহাড়ের মরা গাছের গুঁড়ি কিংবা উইপোকার ঢিবিগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। দু-এক দিনের মধ্যেই মরা কাঠের বুক চিরে বেরিয়ে আসে সাদা ছাতার মতো দৃষ্টিনন্দন বস্তু। শহরবাসী একে ‘ব্যাঙের ছাতা’ বলে এড়িয়ে গেলেও, আদিবাসী পাহাড়িদের কাছে এটি মোটেও অবহেলার নয়; বরং এটি তাদের প্রিয় ‘ওল’ বা মাশরুম, যা তারা আদর করে ডাকে ‘দেবতার উপহার’।
ছবিতে দেখা যাওয়া এই বুনো মাশরুমগুলো কেবল সৌন্দর্যই ছড়ায় না, এগুলো পুষ্টির এক বিশাল ভাণ্ডার। আদিবাসী সংস্কৃতির সাথে এই মাশরুমের সম্পর্ক শত শত বছরের পুরোনো। জুম চাষের কঠোর পরিশ্রমের মাঝে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে এই প্রাকৃতিক মাশরুমই তাদের প্রধান ভরসা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মতে, মাশরুমকে বলা হয় “সুপারফুড”। ছবিতে দৃশ্যমান বুনো মাশরুমের প্রজাতিগুলো বিশ্বজুড়ে পুষ্টিবিদদের নজর কেড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে (যেমন- ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন) উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই মাশরুমগুলোতে: উচ্চমানের প্রোটিন: ১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমে ২৫ থেকে ৩৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা মাছ বা মাংসের চেয়েও বেশি। এটি পেশী গঠন ও ক্ষয়পূরণে অভাবনীয় কাজ করে।
ভিটামিনের খনি: বিশেষ করে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স (থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, নিয়াসিন), যা শরীরের শক্তি উৎপাদনে অপরিহার্য। এতে আছে ভিটামিন ডি এবং সি, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
মিনারেল: প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং সেলেনিয়াম রয়েছে। সেলেনিয়াম একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক।
এই তথ্যটি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রীহিত।

পাহাড়িদের মন জয় করা খাবার : পাহাড়ে মাশরুম সংগ্রহের উৎসবের মতো পরিবেশ তৈরি হয়। বাঁশ বা বেতনির্মিত বিশেষ ঝুড়ি—যা সোনা-রুপার গহনা রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়—তাতে করে পাহাড়িরা এই মূল্যবান সম্পদ সংগ্রহ করেন।
বিলাইছড়ি বটতুলী মোহন পাড়া (তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ার) গ্রাম প্রধান (কারবারি) ছেলে ইন্দ্রজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “এই মাশরুম দেবতার পাঠানো অমূল্য ধন। আমরা বিশ্বাস করি এটি আমাদের বার্ধক্য ঠেকিয়ে রাখে এবং বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করে। এটি খেতে এত সুস্বাদু যে, একবার যে খেয়েছে, সে এর স্বাদ ভুলবে না।”
মরা গাছের বুক চিরে জন্মানো এই খাদ্যটি প্রমাণ করে, প্রকৃতি তার সন্তানদের শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয় না। আদিবাসী ঐতিহ্যের এই ‘প্রাকৃতিক প্রোটিন’ আজ বিশ্বজুড়ে পুষ্টির এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রকৃতির এই অনন্য দান যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হলে প্রকৃতিও আমাদের যত্ন নেয়।

বিলাইছড়িতে ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষকেরা ; ৮০% পাকলে কাটার পরামর্শ কৃষি অফিসের





