পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত নেতৃত্ব: নামমাত্র সম্মানীর আড়ালে আইনি ও সামাজিক সংকট
লেখক : ছন্দসেন চাকমা
সম্প্রতি সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল চিফ, হেডম্যান (মৌজা প্রধান) এবং কারবারিদের (গ্রাম প্রধান) মাসিক সম্মানী ভাতা পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কারবারিদের ১,০০০ টাকা এবং হেডম্যানদের ২,০০০ টাকা করা হয়েছে।
একজন পেশাদার ফটোসাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী হিসেবে দীর্ঘকাল পার্বত্য অঞ্চলের তৃণমূল পর্যায়, ভিসিএফ (ভিলেজ কমন ফরেস্ট) এবং হেডম্যান-কারবারি নেটওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশনের সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকেই বলতে হয়—আপাতদৃষ্টিতে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং পাহাড়ের জটিল ভূ-রাজনীতির নিরিখে এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়, বরং পাহাড়ের প্রথাগত কাঠামোর ভেতরের সংকটকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা।
বর্তমান বাজারে ১ কেজি দেশি মুরগির দাম যেখানে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং মাছের কেজি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা, সেখানে ২,০০০ বা ১,০০০ টাকা দিয়ে একটি পরিবারের বড়জোর ১ থেকে ৩ দিনের খাবার জুটতে পারে। ফলে এই সামান্য সম্মানী দিয়ে প্রথাগত নেতাদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা তো দূরের কথা, সাধারণ জীবন ধারণ করাই অসম্ভব। উপরন্তু, ১৯০০ সালের রেগুলেশন বা পার্বত্য আইন অনুযায়ী কর আদায়ের যে কাঠামো রয়েছে, তাতে ভাতা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ জুমচাষীদের ওপর করের বোঝাও হয়তো এবার আরও বাড়বে—এমন একটি অর্থনৈতিক আশঙ্কাও প্রান্তিক মানুষের মনে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
পাহাড়ের ভূমি ও বিচারিক ব্যবস্থার দিকে তাকালে এক বহুরূপী সংকটের চিত্র চোখে পড়ে। একদিকে ভারত থেকে ফিরে আসা শরণার্থীরা আজও তাদের নিজস্ব ভূমি ফেরত পায়নি, অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী প্রভাবের কারণে প্রথাবদ্ধ বিচার ব্যবস্থা এবং ভূমির অধিকার আজ এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে হেডম্যান-কারবারিদের প্রথাগত বিচারিক ক্ষমতা কতটা স্বাধীনভাবে কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকটটি দৃশ্যমান হয় যখন পাহাড়ের প্রশাসনিক দ্বৈততা সামনে আসে। একদিকে সারা বাংলাদেশে প্রচলিত ‘ইউনিয়ন পরিষদ আইন’, অন্যদিকে ১৯০০ সালের রেগুলেশন বা পাহাড়ের প্রথাগত রীতি—এই দুইয়ের আইনি সীমানা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পাহাড়ের শাসনব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত জটিল করে তুলছে। রাষ্ট্র যেখানে বাহিনী বনাম শান্তিচুক্তির স্থবিরতা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসনে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে প্রথাগত নেতাদের নেটওয়ার্ক বা অ্যাসোসিয়েশনকে কেবল সামান্য ভাতা বৃদ্ধি কিংবা দায়সারা ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কতটা বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে এই প্রজ্ঞাপনের সময়জ্ঞান নিয়ে। পার্বত্য অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পদত্যাগের ঠিক পরপরই এমন একটি গেজেট প্রকাশ করা হলো। এই টাইমিং কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি মূল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট থেকে নজর ঘুরানোর চেষ্টা ? বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র অপচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন।
পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও প্রথাগত নেতৃত্বের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে কেবল আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। রাজা (সার্কেল চিফ), হেডম্যান ও কারবারিদের প্রথাগত রীতি-নীতি, বনভূমি (ভিসিএফ) এবং ভূমির অধিকার রক্ষা করতে হলে প্রচলিত ইউনিয়ন পরিষদ আইনের সাথে এর একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন। এই আইনি সংঘর্ষ এড়াতে একটি সমন্বিত খসড়া বিল প্রস্তুত করে তা সংসদে পাস করা আজ সময়ের দাবি।
অন্যথায়, এই নামমাত্র ভাতা বৃদ্ধি পাহাড়ের মূল প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংকটকে আড়াল করার একটি সাময়িক চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: ফটো সাংবাদিক ও পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাতা।

রুমা উপজেলায় ইউনিসেফ-সহায়তাপুষ্ট পাড়াকেন্দ্রে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত, এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ



