| ৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম:

“প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের মিলনে আগামীর পথচলা”

“প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের মিলনে আগামীর পথচলা”

 

‎লেখক : ‎সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ ……

‎একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নবীন প্রজন্মের স্বপ্ন, সাহস ও সৃজনশীলতার ওপর। তারুণ্য হলো পরিবর্তনের অগ্রদূত, নতুন সম্ভাবনার নির্মাতা এবং আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। অন্যদিকে প্রবীণরা সমাজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ধারক। এই দুই শক্তির সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ, গতিশীল ও সমৃদ্ধ সমাজ। নবীনদের উদ্যম এবং প্রবীণদের প্রজ্ঞার মধ্যে যখন আস্থা, সম্মান ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়, তখনই সমাজ এগিয়ে যায় উন্নতি ও কল্যাণের পথে।

‎বৌদ্ধ ধর্ম এই পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ বুদ্ধের শিক্ষা কেবল আত্মিক মুক্তির পথই নির্দেশ করে না, বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলারও দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

বৌদ্ধ ধর্মে তারুণ্যের মূল্য ও সম্ভাবনা :

‎গৌতম বুদ্ধের জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার বয়স দ্বারা নয়, বরং তার চরিত্র, সাধনা, জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে। বুদ্ধের অনেক প্রধান শিষ্য তরুণ বয়সেই সংঘে প্রবেশ করেছিলেন এবং অধ্যবসায়, আত্মনিয়োগ ও প্রজ্ঞার বলে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে ছিলেন।

‎বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি মানুষের অন্তরে জাগরণের অসীম সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা,   অনুকূল পরিবেশ এবং আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক। তাই তরুণদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা মানে কেবল তাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা নয়; বরং তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া।

‎আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান শক্তি। তাদের প্রতি আস্থা রাখা মানে ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা রাখা।

মৈত্রী, করুণা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা :

‎বৌদ্ধ ধর্মের চার ব্রহ্মবিহার—মৈত্রী (মেত্তা), করুণা, মুদিতা এবং উপেক্ষা—মানবিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। মৈত্রী আমাদের শেখায় সকল প্রাণীর কল্যাণ কামনা করতে, করুণা শেখায় অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করতে, মুদিতা শেখায় অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে এবং উপেক্ষা শেখায় ভারসাম্যপূর্ণ ও উদার মানসিকতা ধারণ করতে।

‎যখন প্রবীণরা নবীনদের প্রতি আস্থা রাখেন, তাদের চিন্তা-ভাবনাকে গুরুত্ব দেন এবং ভুল করার সুযোগসহ শেখার পরিবেশ তৈরি করেন, তখন তারা প্রকৃত অর্থেই মৈত্রী ও করুণার চর্চা করেন। একইভাবে, যখন নবীনরা প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে এবং তাদের পরামর্শ থেকে শিক্ষা নেয়, তখন সমাজে গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসের সংস্কৃতি। আস্থা ও শ্রদ্ধার এই বন্ধনই প্রজন্মের ব্যবধান দূর করে এবং সমাজকে সংঘাতের পরিবর্তে সম্প্রীতির পথে পরিচালিত করে।

‎আস্থা: বিকাশের প্রথম শর্ত :

‎বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই তরুণদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। তাদের অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নেতৃত্বের সুযোগ থেকে দূরে রাখা হয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—প্রতিটি সফল মানুষই একসময় ছিল অনভিজ্ঞ, আর প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে ছিল শেখার দীর্ঘ পথচলা।

‎বুদ্ধের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভুল মানুষের স্বাভাবিক শিক্ষক। ভুলের ভয় নয়, বরং ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণই উন্নতির পথকে সুগম করে। তাই নবীনদের প্রতি অবিশ্বাস নয়, বরং সহানুভূতি, দিকনির্দেশনা এবং উৎসাহ প্রদানই হওয়া উচিত সমাজের দায়িত্ব।

‎যে সমাজ তার তরুণদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যতের ওপরও আস্থা রাখতে পারে না। কারণ আস্থাহীন পরিবেশ প্রতিভাকে সংকুচিত করে, আর আস্থাপূর্ণ পরিবেশ সম্ভাবনাকে বিকশিত করে।

‎পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয় :

‎একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব কেবল পরিবারের নয়; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করতে পারে। সমাজে তরুণদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বীকৃতি ও উৎসাহ প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং কর্মশক্তি জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

‎ইতিহাসের আলোকবর্তিকা :

‎মানব সভ্যতার ইতিহাসে যত বড় পরিবর্তন, নবজাগরণ ও অগ্রগতি ঘটেছে, তার পেছনে তরুণদের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজ যখন নবীনদের ওপর আস্থা রেখেছে, তখনই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আবার সেই পরিবর্তনকে সুসংহত ও স্থায়ী রূপ দিয়েছেন প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা। অতএব, উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি কোনো একক প্রজন্মের হাতে নয়; বরং নবীনদের কর্মশক্তি এবং প্রবীণদের জীবনবোধের সম্মিলিত প্রয়াসেই নিহিত।

‎উপসংহার :

‎বৌদ্ধ ধর্মের আলোকে নবীনদের প্রতি আস্থা রাখা কেবল একটি সামাজিক কর্তব্য নয়; এটি মানবিকতা, মৈত্রী, করুণা এবং প্রজ্ঞার এক অনন্য প্রকাশ। তরুণদের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে ভবিষ্যতের প্রতি আশা জাগানো, আর তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা মানে একটি উন্নত সমাজের ভিত্তি নির্মাণ করা।

‎আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে প্রবীণদের প্রজ্ঞা হবে দিকনির্দেশনার আলো, আর নবীনদের শক্তি হবে অগ্রযাত্রার প্রেরণা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই নির্মিত হবে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক, প্রগতিশীল এবং আলোকিত ভবিষ্যৎ।

‎লেখক- সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ
‎গগণমাধ্যম ও সমাজ কর্মী
‎আলীকদম।

রুমা উপজেলায় ইউনিসেফ-সহায়তাপুষ্ট পাড়াকেন্দ্রে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত, এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ

“প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের মিলনে আগামীর পথচলা”

 

মথি ত্রিপুরা, রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্প এবং ইউনিসেফের (UNICEF) সহায়তায় পরিচালিত পাড়াকেন্দ্রগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম নানা সংকটে ব্যাহত হচ্ছে। পাড়াকর্মীদের বেতন-ভাতা কমে যাওয়া, কেন্দ্রগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পাড়াকর্মীরা।

পাড়াকর্মীরা জানান, ২০২৪ সালে প্রকল্প কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর দীর্ঘদিন নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে গেছেন। তবে বর্তমানে অনেক পাড়াকেন্দ্র অগোছালো ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রগুলোতে পাঠদান সম্ভব না হওয়ায় নিজ নিজ বাড়িতে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে। একজন পাড়াকর্মী বলেন, পাড়াকেন্দ্রগুলো মেরামত কিংবা পুনর্নির্মাণ করা হলে শিশুদের জন্য সুষ্ঠুভাবে পাঠদান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

পাড়াকর্মীদের অভিযোগ, আগে মাসিক ৯ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা পেলেও বর্তমানে তা কমে ৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। ফলে পরিবার পরিচালনা করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে স্বল্প বেতনে দায়িত্ব পালন করেও অনেকেই আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেতন-ভাতার সংকট ও বিভিন্ন সমস্যার কারণে বেশ কয়েকটি পাড়াকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে দুর্গম এলাকার শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, অভিভাবক ও পাড়াকর্মীরা দ্রুত পাড়াকেন্দ্রগুলো পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করে কার্যক্রম সচল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প ম্যানেজার (UPM) থুইসাচিং মারমা বলেন, বেতন কমে যাওয়ার কারণে অনেক পাড়াকর্মী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আগে ১০৯ জন পাড়াকর্মী কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৬ জন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রকল্প অফিসের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। বৃষ্টির সময় অফিসে পানি জমে যায়। এছাড়া একটি ফটোকপি মেশিন ও কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প ম্যানেজার জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার দুর্গম এলাকায় পরিচালিত পাড়াকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা প্রদান করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ৬ থেকে ২৪ মাস বয়সী ৫৩৫ জন শিশুকে নিয়মিত পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নে পাড়াকর্মী ও মাঠ সংগঠকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

স্থানীয়দের দাবি, পাড়াকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, পাড়াকর্মীদের বেতন-ভাতা পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হোক, যাতে দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ব্যাহত না হয়।

গাইবান্ধায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের চেষ্টা, শিক্ষককে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোর্পদ

“প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের মিলনে আগামীর পথচলা”

 

মানিক সাহা, গাইবান্ধা:

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ায় মাদ্রাসার এক শিশু শিক্ষাকে বলাৎকারের চেষ্টার অভিযোগে রবিউল ইসলাম নামের এক শিক্ষককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ার জামিয়া কওমি দারুল উলুম মাদ্রাসার অফিস কক্ষে বলাৎকারের চেষ্টার এ ঘটনা ঘটে। ‎

স্থানীয়রা জানান, রবিউল ইসলাম প্রায় এক মাস আগে মাদ্রাসাটিতে চাকরিতে যোগ দেন। তিনি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। ‎মাদ্রাসাটি সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের শিমুলতাইড় গ্রামের রেলওয়ে বানমারি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার রতন মিয়া জানান, ঘটনাটি শোনার পরে আমি ঘটনা স্থলে গিয়ে অভিযুক্তকে পুলিশে দেয়ার ব্যবস্থা করি৷ ‎সাঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এলাকাবাসী আটকে রেখেছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত নেতৃত্ব: নামমাত্র সম্মানীর আড়ালে আইনি ও সামাজিক সংকট

“প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের মিলনে আগামীর পথচলা”

 

​লেখক : ছন্দসেন চাকমা

​সম্প্রতি সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল চিফ, হেডম্যান (মৌজা প্রধান) এবং কারবারিদের (গ্রাম প্রধান) মাসিক সম্মানী ভাতা পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কারবারিদের ১,০০০ টাকা এবং হেডম্যানদের ২,০০০ টাকা করা হয়েছে।

একজন পেশাদার ফটোসাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী হিসেবে দীর্ঘকাল পার্বত্য অঞ্চলের তৃণমূল পর্যায়, ভিসিএফ (ভিলেজ কমন ফরেস্ট) এবং হেডম্যান-কারবারি নেটওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশনের সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকেই বলতে হয়—আপাতদৃষ্টিতে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং পাহাড়ের জটিল ভূ-রাজনীতির নিরিখে এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়, বরং পাহাড়ের প্রথাগত কাঠামোর ভেতরের সংকটকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা।

বর্তমান বাজারে ১ কেজি দেশি মুরগির দাম যেখানে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং মাছের কেজি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা, সেখানে ২,০০০ বা ১,০০০ টাকা দিয়ে একটি পরিবারের বড়জোর ১ থেকে ৩ দিনের খাবার জুটতে পারে। ফলে এই সামান্য সম্মানী দিয়ে প্রথাগত নেতাদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা তো দূরের কথা, সাধারণ জীবন ধারণ করাই অসম্ভব। উপরন্তু, ১৯০০ সালের রেগুলেশন বা পার্বত্য আইন অনুযায়ী কর আদায়ের যে কাঠামো রয়েছে, তাতে ভাতা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ জুমচাষীদের ওপর করের বোঝাও হয়তো এবার আরও বাড়বে—এমন একটি অর্থনৈতিক আশঙ্কাও প্রান্তিক মানুষের মনে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।​

পাহাড়ের ভূমি ও বিচারিক ব্যবস্থার দিকে তাকালে এক বহুরূপী সংকটের চিত্র চোখে পড়ে। একদিকে ভারত থেকে ফিরে আসা শরণার্থীরা আজও তাদের নিজস্ব ভূমি ফেরত পায়নি, অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী প্রভাবের কারণে প্রথাবদ্ধ বিচার ব্যবস্থা এবং ভূমির অধিকার আজ এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে হেডম্যান-কারবারিদের প্রথাগত বিচারিক ক্ষমতা কতটা স্বাধীনভাবে কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় রয়েছে।

​সবচেয়ে বড় সংকটটি দৃশ্যমান হয় যখন পাহাড়ের প্রশাসনিক দ্বৈততা সামনে আসে। একদিকে সারা বাংলাদেশে প্রচলিত ‘ইউনিয়ন পরিষদ আইন’, অন্যদিকে ১৯০০ সালের রেগুলেশন বা পাহাড়ের প্রথাগত রীতি—এই দুইয়ের আইনি সীমানা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পাহাড়ের শাসনব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত জটিল করে তুলছে। রাষ্ট্র যেখানে বাহিনী বনাম শান্তিচুক্তির স্থবিরতা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসনে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে প্রথাগত নেতাদের নেটওয়ার্ক বা অ্যাসোসিয়েশনকে কেবল সামান্য ভাতা বৃদ্ধি কিংবা দায়সারা ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কতটা বাস্তবসম্মত ‍ও যুক্তিযুক্ত ?

​সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে এই প্রজ্ঞাপনের সময়জ্ঞান নিয়ে। পার্বত্য অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পদত্যাগের ঠিক পরপরই এমন একটি গেজেট প্রকাশ করা হলো। এই টাইমিং কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি মূল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট থেকে নজর ঘুরানোর চেষ্টা ? বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র অপচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন।
​পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও প্রথাগত নেতৃত্বের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে কেবল আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। রাজা (সার্কেল চিফ), হেডম্যান ও কারবারিদের প্রথাগত রীতি-নীতি, বনভূমি (ভিসিএফ) এবং ভূমির অধিকার রক্ষা করতে হলে প্রচলিত ইউনিয়ন পরিষদ আইনের সাথে এর একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন। এই আইনি সংঘর্ষ এড়াতে একটি সমন্বিত খসড়া বিল প্রস্তুত করে তা সংসদে পাস করা আজ সময়ের দাবি।

অন্যথায়, এই নামমাত্র ভাতা বৃদ্ধি পাহাড়ের মূল প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংকটকে আড়াল করার একটি সাময়িক চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

​লেখক: ফটো সাংবাদিক ও পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাতা।

×