“প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের মিলনে আগামীর পথচলা”
লেখক : সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ ……
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নবীন প্রজন্মের স্বপ্ন, সাহস ও সৃজনশীলতার ওপর। তারুণ্য হলো পরিবর্তনের অগ্রদূত, নতুন সম্ভাবনার নির্মাতা এবং আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। অন্যদিকে প্রবীণরা সমাজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ধারক। এই দুই শক্তির সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ, গতিশীল ও সমৃদ্ধ সমাজ। নবীনদের উদ্যম এবং প্রবীণদের প্রজ্ঞার মধ্যে যখন আস্থা, সম্মান ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়, তখনই সমাজ এগিয়ে যায় উন্নতি ও কল্যাণের পথে।
বৌদ্ধ ধর্ম এই পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ বুদ্ধের শিক্ষা কেবল আত্মিক মুক্তির পথই নির্দেশ করে না, বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলারও দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
বৌদ্ধ ধর্মে তারুণ্যের মূল্য ও সম্ভাবনা :
গৌতম বুদ্ধের জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার বয়স দ্বারা নয়, বরং তার চরিত্র, সাধনা, জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে। বুদ্ধের অনেক প্রধান শিষ্য তরুণ বয়সেই সংঘে প্রবেশ করেছিলেন এবং অধ্যবসায়, আত্মনিয়োগ ও প্রজ্ঞার বলে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে ছিলেন।
বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি মানুষের অন্তরে জাগরণের অসীম সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, অনুকূল পরিবেশ এবং আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক। তাই তরুণদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা মানে কেবল তাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা নয়; বরং তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান শক্তি। তাদের প্রতি আস্থা রাখা মানে ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা রাখা।
মৈত্রী, করুণা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা :
বৌদ্ধ ধর্মের চার ব্রহ্মবিহার—মৈত্রী (মেত্তা), করুণা, মুদিতা এবং উপেক্ষা—মানবিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। মৈত্রী আমাদের শেখায় সকল প্রাণীর কল্যাণ কামনা করতে, করুণা শেখায় অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করতে, মুদিতা শেখায় অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে এবং উপেক্ষা শেখায় ভারসাম্যপূর্ণ ও উদার মানসিকতা ধারণ করতে।
যখন প্রবীণরা নবীনদের প্রতি আস্থা রাখেন, তাদের চিন্তা-ভাবনাকে গুরুত্ব দেন এবং ভুল করার সুযোগসহ শেখার পরিবেশ তৈরি করেন, তখন তারা প্রকৃত অর্থেই মৈত্রী ও করুণার চর্চা করেন। একইভাবে, যখন নবীনরা প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে এবং তাদের পরামর্শ থেকে শিক্ষা নেয়, তখন সমাজে গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসের সংস্কৃতি। আস্থা ও শ্রদ্ধার এই বন্ধনই প্রজন্মের ব্যবধান দূর করে এবং সমাজকে সংঘাতের পরিবর্তে সম্প্রীতির পথে পরিচালিত করে।
আস্থা: বিকাশের প্রথম শর্ত :
বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই তরুণদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। তাদের অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নেতৃত্বের সুযোগ থেকে দূরে রাখা হয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—প্রতিটি সফল মানুষই একসময় ছিল অনভিজ্ঞ, আর প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে ছিল শেখার দীর্ঘ পথচলা।
বুদ্ধের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভুল মানুষের স্বাভাবিক শিক্ষক। ভুলের ভয় নয়, বরং ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণই উন্নতির পথকে সুগম করে। তাই নবীনদের প্রতি অবিশ্বাস নয়, বরং সহানুভূতি, দিকনির্দেশনা এবং উৎসাহ প্রদানই হওয়া উচিত সমাজের দায়িত্ব।
যে সমাজ তার তরুণদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যতের ওপরও আস্থা রাখতে পারে না। কারণ আস্থাহীন পরিবেশ প্রতিভাকে সংকুচিত করে, আর আস্থাপূর্ণ পরিবেশ সম্ভাবনাকে বিকশিত করে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয় :
একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব কেবল পরিবারের নয়; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করতে পারে। সমাজে তরুণদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বীকৃতি ও উৎসাহ প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং কর্মশক্তি জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
ইতিহাসের আলোকবর্তিকা :
মানব সভ্যতার ইতিহাসে যত বড় পরিবর্তন, নবজাগরণ ও অগ্রগতি ঘটেছে, তার পেছনে তরুণদের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজ যখন নবীনদের ওপর আস্থা রেখেছে, তখনই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আবার সেই পরিবর্তনকে সুসংহত ও স্থায়ী রূপ দিয়েছেন প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা। অতএব, উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি কোনো একক প্রজন্মের হাতে নয়; বরং নবীনদের কর্মশক্তি এবং প্রবীণদের জীবনবোধের সম্মিলিত প্রয়াসেই নিহিত।
উপসংহার :
বৌদ্ধ ধর্মের আলোকে নবীনদের প্রতি আস্থা রাখা কেবল একটি সামাজিক কর্তব্য নয়; এটি মানবিকতা, মৈত্রী, করুণা এবং প্রজ্ঞার এক অনন্য প্রকাশ। তরুণদের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে ভবিষ্যতের প্রতি আশা জাগানো, আর তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা মানে একটি উন্নত সমাজের ভিত্তি নির্মাণ করা।
আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে প্রবীণদের প্রজ্ঞা হবে দিকনির্দেশনার আলো, আর নবীনদের শক্তি হবে অগ্রযাত্রার প্রেরণা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই নির্মিত হবে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক, প্রগতিশীল এবং আলোকিত ভবিষ্যৎ।
লেখক- সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ
গগণমাধ্যম ও সমাজ কর্মী
আলীকদম।

| ৬ জুন ২০২৬














