মতভিন্নতা ও আঞ্চলিক রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রাম : আস্থার সেতু পুনর্গঠনের এখনই সময়
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি :
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অনন্য ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল। দীর্ঘদিনের সংঘাত, অবিশ্বাস ও বঞ্চনার ইতিহাস পেরিয়ে ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এখানে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। সেই চুক্তির মূল চালিকাশক্তিই ছিল—পারস্পরিক আস্থা, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনগোষ্ঠীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব।
সংবাদ সম্মেলনে যৌথ ব্রিফিং ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর :
আজ ৪ জুন ২০২৬ রাঙামাটিতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ২৯৯ নং সংসদীয় আসন-রাঙামাটির সাবেক সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের পক্ষে যৌথভাবে প্রেস ব্রিফিং করেন বিশিষ্ট আঞ্চলিক নেতা পহেল চাকমা এবং এম এ আবুল বাশার। ব্রিফিং শেষে নেতৃদ্বয় পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন তীক্ষ্ণ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন এবং মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক রদবদল নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে আলোকপাত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নেতৃদ্বয় অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপন দেওয়ানকে পুনর্বহাল এবং বর্তমান মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। এই দাবি মূলত এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনের গভীরে থাকা সুপ্ত প্রত্যাশা ও তীব্র উদ্বেগেরই আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ।
নেতৃবৃন্দের স্পষ্ট বক্তব্য :
“এই দাবিকে কেবল কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পদকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি বৃহত্তর মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মূল চেতনা আজ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?”
পহেল চাকমা ও এম এ আবুল বাশার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, শান্তিচুক্তিতে যেভাবে স্থানীয় আদিবাসী ও স্থায়ী জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে কি না—তা এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
শাসন কাঠামো ও অনির্বাচিত পরিষদের স্থবিরতা :
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদসমূহের দীর্ঘদিনের অনির্বাচিত অবস্থা সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল ও স্থবির করেছে—এমন অভিযোগ কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পার্বত্য অঞ্চলে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিত্বের কোনো বিকল্প নেই। ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
সমাধানের পথ :
সংলাপ ও অন্তর্ভুক্তি তবে এই উদ্ভূত সংকটের সমাধান কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব, সংঘাত বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং উন্মুক্ত সংলাপ, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা এবং সর্বস্তরের মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বাস্তবতায় স্থানীয় নেতৃত্বের এই যৌক্তিক দাবিগুলোকে সরকারের একটি ইতিবাচক সাড়া ও ফিডব্যাক হিসেবে দেখা উচিত।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের সমাপনী উত্তর দিতে গিয়ে নেতৃবৃন্দ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে অতীতে যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল, ঠিক তেমনি বর্তমান পরিস্থিতিও তাঁর কাছ থেকে একটি বিচক্ষণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি মানুষ যেন মন থেকে অনুভব করতে পারেন যে, তারা এই স্বাধীন রাষ্ট্রের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক এবং তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আস্থার এই সেতুটি যত মজবুত হবে, ততই পার্বত্য অঞ্চলে টেকসই শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রয়োজন কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে কৃত্রিমভাবে জিতিয়ে দেওয়া নয়, বরং সকল অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য ও স্থিতিশীল সমাধানের দিকে সততার সাথে এগিয়ে যাওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং শান্তিময় সহাবস্থান আজকের এই সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সূত্র :
২৯৯ নং সংসদীয় আসন-রাঙামাটির সাবেক এমপি পদপ্রার্থীদের পক্ষে পহেল চাকমা ও এম এ আবুল বাশার কর্তৃক উপস্থাপিত মূল বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর পর্ব (৪ জুন ২০২৬)।

| ৫ জুন ২০২৬

















