চট্টগ্রামে ধর্ষণ অভিযোগে রণক্ষেত্র বাকলিয়া ; গভীর রাত পর্যন্ত থানা ঘেরাও
এম এস শ্রাবণ মাহমুদ :
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষন ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় সারাদেশ যখন উত্তাল, ঠিক সেই মুহুর্তে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকায় চার বছরের এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ২১ মে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বিক্ষুব্ধ জনতা চলমান রাষ্ট্রিয় বিচার ব্যবস্থার প্রতি ক্ষূদ্ধ মনোভাব প্রকাশ করে অভিযুক্ত যুবককে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।
রাত ১০ঃটার সময় পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়।
শিশু ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতা ও পুলিশের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে)২৬ খ্রিঃ রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে দুই সাংবাদিকসহ অন্তত ২৩ জন আহত হন।
পরিস্থিতি এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা রাতে জড়ো হলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে জনতা ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক পর্যন্ত। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই সাংবাদিকসহ তিনজন আহত হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নগরীর বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যান ঘাটা আবু জাফর রোড এলাকার চার বছরের এক শিশু বিকেলে নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত শিশুর শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিকেল পাঁচটার দিকে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত যুবকের নাম মনির। তিনি স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তিনি তাঁদের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
ঘটনার পর স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামে একটি ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে ভবনের কলাপসিবল গেট ভেঙে ফেলারও চেষ্টা চালানো হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা পুলিশের পথরোধ করে তাঁকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়।
বিক্ষুব্ধ লোকজনকে বলতে শোনা যায়, “বাংলাদেশে বিচার নেই। ধর্ষককে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা মেরে ফেলব। বিচার আমরাই করবো।” পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
এ সময় সংবাদ সংগ্রহ ও লাইভ সম্প্রচারের সময় আহত হন দুই সাংবাদিক।
আহতরা হলেন, মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান।
জানা গেছে, নোবেল হাসানের হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। মামুন আবদুল্লাহর কোমর ও পায়ে আঘাত লাগে। আহত দুই সাংবাদিককে প্রথমে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভর্তি করা হয়।
এছাড়া পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে স্থানীয় কয়েকজন যুবকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে রাত ১০টার পর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়েই বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, অভিযুক্তকে থানায় আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা। তাঁরা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়।
রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল থানা ঘেরাও করতে মূল সড়কে অবস্থান নেয়।
এ সময় কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন আরও কয়েকজন সাংবাদিক। আজকের পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক আব্দুল কাইয়ুম-কে একটি কমিউনিটি সেন্টারের ছাদে বেশ কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
পরে তিনি ফেসবুকে আটকে থাকার বিষয়টি জানালে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে।
রাত ৩ঃ৩০ মিনিট এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

| ২৩ মে ২০২৬






