নিজস্ব প্রতিনিধি, বান্দরবান :
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের বিশেষ প্রকল্প কর্মসূচির আওতায় খাদ্যশস্য বরাদ্দ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় তদারকির ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে বরাদ্দ আত্মসাতের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জানা যায়, জীবন-জীবিকা উন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব দূরীকরণ ও দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চলতি অর্থবছরে বিশেষ প্রকল্প কর্মসূচির আওতায় রুমা উপজেলার জন্য মোট ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে মহিলা মেম্বারদের নামে ৪০ মেট্রিক টন এবং তিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের নামে ৬০ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বান্দরবান জেলা পরিষদে তথ্যের সূত্র জানায়, ডিউ সব দেওয়া হয়ে গেছে চেয়ারম্যান ও মহিলা মেম্বার সহ মিলে ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের একটি অংশ থেকে ১নং পাইন্দু ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য অংমেসিং মারমা, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য ভান নুন এং বম, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য উম্রানু মারমা এবং ৪নং গালেঙ্গা ইউনিয়নের মহিলা সদস্য পাইংপিয় ম্রো প্রত্যেকে ১০ মেট্রিক টন করে বরাদ্দ পান। চারজন মিলে মোট ৪০ মেট্রিক টন এবং উপজেলা তিন চেয়ারম্যান ৬০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ গ্রহণ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সঠিকভাবে বিতরণের প্রমাণ মিলছে না। উপকারভোগীর তালিকা ও বিতরণের ছবি চাইলেও তা দেখানো হয়নি বলে দাবি তাদের।
পাইন্দু ইউনিয়নের মহিলা সদস্য অংমেসিং মারমা বলেন, “আমরা বরাদ্দ পেয়েছি, তবে পুরো চাল একসঙ্গে হাতে পাইনি। ধাপে ধাপে বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রকল্প নিয়ে আমরা নানা জটিলতায় আছি। এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা হাতে পেয়েছি, চেয়ারম্যানের কাছ থেকে আরও টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে।
মহিলা সদস্য ভান নুন এং বম বলেন, প্রথম ধাপে বরাদ্দের টাকা আমরা পাইনি, চেয়ারম্যান নিজেই উত্তোলন করেছেন। দ্বিতীয় ধাপে আমরা মহিলা মেম্বাররা মিলে জেলা পরিষদ থেকে চেয়ারম্যানের অজান্তে টাকা উত্তোলন করি। বিষয়টি জানার পর চেয়ারম্যান আমাদের নানাভাবে হয়রানি করেন। প্রথম ধাপের টাকা নিয়ে আমরা শিগগিরই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেব।
পাইন্দু ইউনিয়নের মহিলা সদস্য উম্রানু মারমার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গালেঙ্গা ইউনিয়নের মহিলা সদস্য পাইংপিয় ম্রোর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ছেলে চিংওয়াই ম্রো জানান, এমন কোনো বিতরণের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। মা এখন একটি অনুষ্ঠানে আছেন। ফ্রি হলে তাকে বিষয়টি জানাবো।
অন্যদিকে বিশেষ প্রকল্প কর্মসূচির আওতায় পৃথক বরাদ্দ থেকে তিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ২০ মেট্রিক টন করে মোট ৬০ মেট্রিক টন চাল পান।
১নং পাইন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা কৃষি সামগ্রী বিতরণ ও দুগ্ধজাত গাভী পালনের প্রকল্পের নামে ২০ মেট্রিক টন বরাদ্দ পান। তবে সরেজমিনে গিয়ে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
পাইন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা বলেন, “কৃষি সামগ্রী ও গাভী পালনের প্রকল্প বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও ধাপে ধাপে বিতরণ করা হচ্ছে। ৩নং রেমাক্রী প্রাংসা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিরা বম একই প্রকল্পের আওতায় ২০ মেট্রিক টন বরাদ্দ পান। সরেজমিনে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিতরণের ছবি বা উপকারভোগীর তালিকা তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে চেয়ারম্যান জিরা বম অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, জেলা পরিষদ এই প্রকল্প থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ কেটে নিয়েছে। প্রতি টনে ৪০ হাজার টাকা হিসেবে পাওয়ার কথা থাকলেও সম্পূর্ণ অর্থ পাইনি। ২০ মেট্রিক টনে প্রায় ৮ লাখ টাকা পাওয়ার কথা, সেটিও পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। বরাদ্দের অর্থ সংকোচনের কারণে বাস্তবায়নে জটিলতা হয়েছে। তবে থাংখ্যং পাড়া ও সুংসং পাড়ায় গরু-ছাগল বিতরণ করা হয়েছে।
রুমা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা বলেন,বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।”
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থাংজামা লুসাই তিনি জানান, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের বিশেষ প্রকল্প বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না। আমরা খাদ্যশস্য প্রকল্প সভাপতিদের কাছে হস্তান্তর করেছি। এখন তারাই ভালো-মন্দ বলতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে চাইলে আমাদের অফিসে ইঞ্জিনিয়ার উসাই মং মারমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি বরাদ্দকৃত প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রকৃত দুঃস্থ ও গরিব পরিবার যাতে প্রাপ্য সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।