রাঙামাটিতে পিসিপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: পার্বত্য চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে ছাত্র-জনতার বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক
বিশেষ প্রতিবেদক, রাঙামাটি :
”সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হোন”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে রাঙামাটিতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও গৌরবময় সংগ্রামের ৩৭ বছর পূর্তি উদযাপিত হয়েছে।
আজ ২০শে মে (বুধবার) রাঙামাটি শহরের কুমার সুমিত রায় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে এই উপলক্ষে এক বিশাল ছাত্র ও জনসমাবেশের আয়োজন করে সংগঠনটির পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।

পিসিপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সহ-সভাপতি শ্রী উষাতন তালুকদার। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির তিন দশক ছুঁইছুঁই করলেও এখনো মৌলিক ধারাগুলো অপূর্ণ রয়ে গেছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া এবং দীর্ঘকাল ধরে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন না হওয়ায় পাহাড়ে এক স্থবির ও দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জুম্ম ছাত্র সমাজকে তাদের ন্যায্য অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রুমেন চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তারা পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সংকট তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ করেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকায় আদিবাসী শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া, প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হলেও শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের অভাবে তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। একই সাথে ১ম ও ২য় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের কোটা সংকুচিত করার তীব্র সমালোচনা করা হয়।

সমাবেশে ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে প্রধান ৫টি দাবি তুলে ধরা হয়:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সূচিসহ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা।
২. আদিবাসী নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বন্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন।
৩. পাহাড়ে জুম্ম অধ্যুষিত বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকট দূর করা।
৪. দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুম্মদের প্রধান সামাজিক উৎসব (বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক) উপলক্ষে ৫ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা।
৫. উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি এবং সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য ৫% কোটা পুনর্বহাল ও কার্যকর করা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুমার সুমিত রায় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয়েছিল চোখ ধাঁধানো প্যান্ডেল ও মঞ্চ। তোরণ ও প্ল্যাকার্ডে সেজেছিল পুরো প্রাঙ্গণ। পাহাড়ে তীব্র গরম উপেক্ষা করেই সকাল থেকে বিভিন্ন উপজেলা ও এলাকা থেকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে সাধারণ ছাত্র-জনতা ও নারীরা সমাবেশে যোগ দেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন পুরো প্যান্ডেল ছিল কানায় কানায় পূর্ণতা।

সমাবেশে পিসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা পাহাড়ে সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিভিন্ন স্থানে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ছাত্র-জনতার এই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সমতলের ছাত্র সমাজকেও পাশে থাকার আহ্বান জানান।

| ২০ মে ২০২৬


















