রুমায় ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্যে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপিত
রুমা প্রতিনিধি:
ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বান্দরবানের রুমায় উদযাপিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা। এ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন পাড়া ও বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকাল ৯টায় রুমা সদর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন বোধিবৃক্ষে পবিত্র চন্দন জল ছিটিয়ে পূর্ণ্য উৎসর্গের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। পরে বুদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে পঞ্চশীল গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিশু-কিশোরসহ নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। একইভাবে ছাইপো পাড়া বৌদ্ধ বিহার, আমতলী বৌদ্ধ বিহার, পলিকা পাড়া বৌদ্ধ বিহার, মিনঝিরি পাড়া বৌদ্ধ বিহার, পান্তলা পাড়া বৌদ্ধ বিহার, পাইন্দু ইউনিয়নের মুলপি পাড়া বৌদ্ধ বিহার, চাঁন্দা হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার, পাইন্দু হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার, নিয়াংক্ষ্যং পাড়া বৌদ্ধ বিহার ও সেঙ্গুম পাড়া বৌদ্ধ বিহারেও ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালিত হয়। এসব বিহারে বোধিবৃক্ষে পবিত্র জল ছিটানো, পূজা, শীল গ্রহণ ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে কেন্দ্রীয় রুমা দেব বুদ্ধ বিহারের দায়ক-দায়িকাদের উদ্যোগে বিশ্বশান্তি কামনায় বিকেল ৪টায় একটি বর্ণাঢ্য শুভযাত্রা বের করা হয়। এতে বিহার পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি সাধন বড়ুয়া ও উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নুম্রাউ মার্মাসহ বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ নারী-পুরুষ অংশ নেন। শুভযাত্রাটি দেব বুদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে রুমা বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় বিহারে এসে শেষ হয়। পরে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ ও দায়ক-দায়িকাদের অংশগ্রহণে পঞ্চশীল গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে পঞ্চশীল প্রদান করেন দেব বুদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ উ চাইন্দাসারা ভিক্ষু। এ সময় লুংঝিরি পাড়া বৌদ্ধ বিহার ও থানা পাড়া বৌদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষগণ উপস্থিত ছিলেন।
বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য:
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জানান, বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত এ দিনটি ‘ত্রিস্মৃতি বিজড়িত পূর্ণিমা’ নামে পরিচিত। কারণ, গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একই পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল বলে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন।
রুমা অগ্রবংশ অনাথালয়ের নির্বাহী পরিচালক ও আশ্রম পাড়া বৌদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ উ নাইন্দিয়া থেরো বলেন, বুদ্ধ পূর্ণিমা মানবতার কল্যাণ, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা ও সাম্যের শিক্ষা স্মরণ করার দিন। বুদ্ধের চতুরার্য সত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গ মানুষের আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথ দেখায়। তিনি আরও বলেন, এ দিনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা উপোসথ শীল পালন, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, দান-ধ্যান এবং জীবহত্যা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আত্মসংযমের চর্চা করেন।
সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা:
বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বিহারগুলোতে ধর্মসভা, প্রদীপ প্রজ্বালন, অন্নদান ও অসহায় মানুষের সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ সম্মিলিতভাবে এ উৎসব উদযাপন করেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
উ নাইন্দিয়া থেরো বলেন, জীবে দয়া ও মানবসেবাই বুদ্ধের মূল শিক্ষা। তাই এ দিনে অসহায়দের সাহায্য, রোগীর সেবা ও দান কর্মের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা হয়।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালে বৈশাখী পূর্ণিমাকে আন্তর্জাতিক ভাবে “Vesak Day” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে বুদ্ধ পূর্ণিমা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মানবতার জয়গান ও আত্মশুদ্ধির এক পবিত্র দিন।



















