| ৬ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম:

পার্বত্য চুক্তির চেতনা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট ; ৩ পার্বত্য জেলায় একযোগে মানববন্ধন

পার্বত্য চুক্তির চেতনা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট ; ৩ পার্বত্য জেলায় একযোগে মানববন্ধন

 

ছন্দ সেন চাকমা, বিশেষ প্রতিনিধি: 

পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহ চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রবল সংশয় ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আজকের দিনে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে স্থানীয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ’-এর মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি মূলত সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই এক যৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

​স্মারকলিপির তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে একজন মন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমেই এই মন্ত্রণালয় গঠিত হবে। অথচ, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকার কর্তৃক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয়দের মতে চুক্তির বিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

​পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনায়। গত ১ জুন ২০২৬ তারিখে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেও, জনমনে প্রবল ধারণা রয়েছে যে তাকে এই পদে থাকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। একজন জনপ্রিয় প্রতিনিধিকে সরিয়ে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের এই ঘটনা পাহাড়ি জনপদ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।

এ পরিস্থিতিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ’ তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে। ​উপজাতীয় ব্যক্তিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগদান নিশ্চিত করা এবং দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করা।

​পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিধান অনুসারে ‘উপদেষ্টা কমিটি’ অবিলম্বে কার্যকর করা। ​মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করা। ​চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উপমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদে কাউকে নিয়োগ না দেওয়া। ​পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা।

​পরিশেষে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দীর্ঘ সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করে নেওয়া যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার ঝুঁকি রাখে। বর্তমান সংকট নিরসনে সরকারের উচিত অবিলম্বে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসা। মনে রাখতে হবে, জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নই পাহাড়ি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ। আস্থাহীনতা দূর করার প্রাথমিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই গ্রহণ করতে হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে থানচিতে গণসংহতি আন্দোলনের গণসমাবেশ

পার্বত্য চুক্তির চেতনা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট ; ৩ পার্বত্য জেলায় একযোগে মানববন্ধন

 

চিংথোয়াই অং মার্মা,
থানচি (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

বান্দরবানের থানচিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার দাবিতে গণসমাবেশ করেছে গণসংহতি আন্দোলন (জিএসএ)।

বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে থানচি বাজার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপজেলা শাখার অর্থ ও দপ্তর সম্পাদক উ থোয়াই ওয়াং মারমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের জাতি বৈচিত্র্য বিষয়ক সম্পাদক উবা থোয়াই মারমা।

উপজেলা শাখার নির্বাহী সমন্বয়কারী সিনয়া ম্রোর সঞ্চালনায় সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে ছিলেন, উপজেলা সমন্বয়কারী মংসাই মারমা। বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন ছাত্র ফেডারেশন থানচি উপজেলা কমিটির সদস্য অং ম্যা থোয়াই মারমা। এছাড়াও সমাবেশে উপজেলা শাখার সদস্য শৈচৌওয়াং মারমা, রুমাজন ত্রিপুরা, রেমাক্রী ইউনিয়ন কমিটির সদস্য থংপং ম্রোসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, জুলাই সনদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জুলাই আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। কিন্তু এখনো জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ ও চেতনা ধারণ করতে হলে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

এ গণসমাবেশে গণসংহতি আন্দোলনের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

ইয়ংম্রং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন

পার্বত্য চুক্তির চেতনা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট ; ৩ পার্বত্য জেলায় একযোগে মানববন্ধন

 

বিশেষ প্রতিনিধি, রাঙামাটি :

“জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ০৫ আগস্ট বুধবার সকালে ইয়ংম্রং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজস্থলীতে ‘জুলাই জাতীয় গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ পালন করা হয়।

দিবসটি উপলক্ষে চিত্রাংকন প্রতিযোগীতা, রচনা প্রতিযোগীতা এবং আলোচনা সভা অনুষ্টিত হয়।

বিদ্যালয়’র সিনিয়র সহকারী শিক্ষক অরুপ কুমার মুৎসুদ্দীর সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যদের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্রানুচিং মার্মা এবং সুমিত্রা চাকমা।

বক্তারা বলেন, সকলের আগে জনতা, জনতার আগে দেশ এবং সবার আগে বাংলাদেশ এটাই আমাদের মনে রাখতে হবে। শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়।

রাইখালীতে দুস্থদের চাল বিতরণ করতে গিয়ে বিপাকে বিএনপি নেতা

পার্বত্য চুক্তির চেতনা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট ; ৩ পার্বত্য জেলায় একযোগে মানববন্ধন

 

কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি :

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের বরাদ্দকৃত বন্যার্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণের চাল বিতরণ নিয়ে কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাজি মো. আবুল হাসেমের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে নানা গুঞ্জন ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও দুস্থ মানুষের মাঝে চাল বিতরণ করা হলেও পরিবহন ও লেবার খরচ বাবদ কিছু চাল সমন্বয় করাকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ​

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে কাপ্তাই উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে বন্যা কবলিত ও হতদরিদ্র দুস্থ পরিবারের মাঝে বিতরণের জন্য মোট ৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রাইখালী ইউনিয়নে মোট ৮ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যায়, যার প্রথম ধাপে ৬ মেট্রিক টন এবং দ্বিতীয় ধাপে ২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে বরাদ্দ পাওয়া ২ মেট্রিক টন চাল বিতরণ নিয়ে এলাকার কিছু মহলে কানাঘুষা শুরু হয়। ​

রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য ক্যওসিংমং চৌধুরী জানান, পরিষদের বরাদ্দ অনুযায়ী রাইখালী ইউনিয়ন যথাযথ নিয়মেই ৮ মেট্রিক টন চাল পেয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাজি মো. আবুল হাসেম গণমাধ্যমের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, রাইখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ সহজে ইউনিয়ন পরিষদে এসে চাল সংগ্রহ করতে পারেন না। এই বাস্তবটি মাথায় রেখে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে দুর্গম পাহাড়ের পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সরাসরি দুস্থদের মাঝে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। গত ৩০ জুন জীপ গাড়িতে করে ২ টন বা (৪০ বস্তা) চাল বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সঠিক তালিকা প্রস্তুত করে ১৯১ জন দুস্থ পরিবারকে মাথাপিছু ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। ​

বিতরণকৃত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে— বড়খোলা পাড়া, ডংনালা পাড়া, পূর্ব কোদালা মারমা পাড়া, কারিগর পাড়া, ভালুকিয়াপাড়া, চাকোয়া পাড়া, বড়পাড়া, নাড়াইছড়ি পাড়া, কচুরি পাড়া, গবছড়া পাড়া, তিনছড়ি পাড়া, তিনছড়ি নোয়া পাড়া, তিনছড়ি মধ্যম পাড়া, কালামাইস্যা পাড়া, বটতলি পাড়া, গংগ্রি ছড়া, বালামছড়ি পাড়া, হাফছড়ি এবং জগনাছড়িসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকা।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে হাজি মো. আবুল হাসেম আরও বলেন, “জেলা পরিষদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে যখন চালগুলো আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তখন গাড়ি ভাড়া বা লেবার খরচের জন্য কোনো আলাদা বরাদ্দ বা অর্থ দেওয়া হয়নি। দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় চাল পরিবহনের খরচ মেটানোর জন্যই সামান্য কিছু চাল সমন্বয় করে খরচ মিটানো হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নিজ দলের একটি কুচক্রী মহল আমাকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করার জন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি বা পাড়ায় পাড়ায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে যাতায়াত খরচ বা পরিবহন ব্যয় সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় না থাকায় অনেক সময় এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঠিক নজরদারি থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

×