| ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম:

প্রান্তিক জনপদের সীমা পেরিয়ে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার সাফল্যের গল্প

প্রান্তিক জনপদের সীমা পেরিয়ে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার সাফল্যের গল্প

 

রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি :

কাপ্তাইয়ের শান্ত-সবুজ ডংনালা গ্রাম থেকে চট্টগ্রাম আদালতের কাঠগড়া—দীর্ঘ এই পথচলার গল্পটি কেবল একজনের ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং অদম্য মানসিকতা ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পাহাড়ের নানামুখী প্রতিকূলতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা জয় করে আইন পেশায় নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তরুণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট হ্লানুচিং মারমা।

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ডংনালা গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মংসুইপ্রু মারমা এবং মা মাঅংচিং মারমার জ্যেষ্ঠ সন্তান হ্লানুচিং। তাঁর ছোট ভাই বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। পারিবারিক অকৃত্রিম সমর্থন ও নিজের শক্ত মনোবলকে পাথেয় করেই তাঁর এই দূরন্ত পথচলা।

হ্লানুচিং মারমার শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ শুরু হয়েছিল নিজ গ্রাম ডংনালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ শেষে তিনি ভর্তি হন রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকে সফলভাবে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে। ২০১২ সালে উক্ত কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর শুরু হয় তাঁর স্বপ্ন ছোঁয়ার আসল লড়াই।

দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমে ২০১৪ সালে তিনি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে (২২তম ব্যাচ)। দেশের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপীঠ থেকে আইনের জটিল পাঠ সাফল্যের সাথে শেষ করে ২০২৩ সালে তিনি লাভ করেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ।

বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলা দায়রা জজ আদালতের সদস্য হিসেবে আইনজীবী পেশায় নিয়মিত প্র্যাকটিস করে যাচ্ছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রান্তিক জনপদ থেকে উঠে এসে এমন একটি সম্মানজনক পেশায় জায়গা করে নেওয়া এই তরুণ আইনজীবী আজ এলাকার যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুকরণীয় নাম।

নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে অ্যাডভোকেট হ্লানুচিং মারমা জানান, সমাজ ও পাহাড়ি অঞ্চলের অসহায়, দরিদ্র এবং বঞ্চিত মানুষদের সঠিক আইনি সেবা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাটাই তাঁর জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই মহান আদর্শকে সম্বল করেই তিনি সামনের দিনগুলোতে আরও দূরদূরান্তে এগিয়ে যেতে চান। হ্লানুচিং মারমার এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য আবারও প্রমাণ করে—লক্ষ্য যদি পাহাড়ের মতো স্থির থাকে এবং পরিশ্রমে কোনো ঘাটতি না থাকে, তবে জীবনের কোনো প্রতিকূলতাই মানুষের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা নির্বাহ উর্পাজন সংস্কার রর্ক্ষাথে প্রান্তিক পরিবর্তন পিছিয়েছে

প্রান্তিক জনপদের সীমা পেরিয়ে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার সাফল্যের গল্প

 

বিশেষ প্রতিবেদক :

পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ১১টি প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী— চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, লুসাই, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমি ও চাক—প্রকৃতি, জুম চাষ ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে বাঁধা এক অনন্য জীবনপ্রবাহের অধিকারী।

​জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি :

জুম চাষ (লেঙবা/ঝুম) : পাহাড়ের ঢালে পাড় কেটে ধান, মারফা, তুলা, তিল ও শাকসবজি ফলানো ঐতিহ্যবাহী ও যৌথ কৃষি ব্যবস্থা।

​মাচাং ঘর : বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মাটির ওপর উঁচুতে তৈরি ঘর, যা আর্দ্রতা ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে এবং নিচের অংশে গবাদি পশু বা জুমের সরঞ্জাম থাকে।

​পানি ও ঝিরি নির্ভরতা : পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা ঝিরি-ঝরনা হলো সুপেয় পানি ও দৈনন্দিন গৃহস্থালির প্রধান উৎস।

​নির্বাচিত জাতিগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার বৈশিষ্ট্য ও রূপরেখা জাতিগোষ্ঠী প্রধান বসতি/অঞ্চল বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও জীবন-জীবিকা তুলে ধরা হলো-

চাকমা : রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি

সমতলের কাছাকাছি বসবাসকারী : স্থায়ী কৃষি ও তাঁতশিল্পে দক্ষ। সাংগ্রাই ও বিজু উৎসবে মুখর।

মারমা : বান্দরবান, খাগড়াছড়ি

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সাংগ্রাই উৎসব ও জলকেলি তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।

ত্রিপুরা : খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি

বৈসুক উৎসব ও গড়াইয়া নৃত্য প্রসিদ্ধ : জুম ও মিশ্র চাষে পারদর্শী।

তঞ্চঙ্গ্যা : রাঙ্গামাটি (কাপ্তাই, রাজস্থলী) ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক (পিনোন-হাদি) ও গহনার বিশেষ কারুকাজ জুম ও মাছ শিকার নির্ভর।

ম্রো : বান্দরবান (রুমা ও থানচি)

প্রকৃতিপূজারি ; বাঁশের তৈরি সুউচ্চ মাচাং ঘর এবং ‘জিয়াং’ বা মুড়ং বাদ্যযন্ত্র ও রিবাং নৃত্য অনন্য।

লুসাই: রাঙ্গামাটি, বান্দরবান

ঐতিহ্যবাহী সুতি কাপড়ের বুনন ও পাহাড়ি ফলমূল সংগ্রহ; তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব কমিউনিটি আইনপ্রিয়।

বম : বান্দরবান

খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বেশি; কোরাস গান, বাঁশশিল্প ও পাহাড়ি জুমচাষে সুসংগঠিত।

পাংখোয়া : রাঙ্গামাটি (বিলাইছড়ি)

ঝরনাপারের অতি দুর্গম এলাকায় বাস; ঝুড়ি ও বাঁশের কারুকাজে সিদ্ধহস্ত।

খিয়াং : বান্দরবান

ছোট পরিসরের জনগোষ্ঠী; মারমা ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাবযুক্ত মিশ্র জীবনধারা।

খুমি : বান্দরবান (থানচি, রুমা)

অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি চূড়ায় বসবাস; চুল বাঁধার ভিন্ন শৈলী এবং কঠোর জুমনির্ভর আত্মনির্ভরশীলতা।

চাক : বান্দরবান (নাইক্ষ্যংছড়ি)

নিজস্ব ভাষা ও বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির বাহক; সীমান্ত ঘেঁষা প্রকৃতিতে জুম ও পাহাড়ি বনজ সম্পদ সংগ্রহজীবী।
বেঁচে থাকার অন্তহীন কাহিনি (সংগ্রাম ও রূপান্তর)
​প্রকৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও সহাবস্থান: খরা, জুম ফলন বিপর্যয় বা পাহাড়ি ঢলে ভূমিধস মোকাবিলা করে তারা প্রতি বছর নতুন করে জুমের বীজ বোনে। এই জীবনপ্রবাহ কেবল অর্থনীতি নয়, এটি এক ধরনের পরিবেশগত দর্শন।

​সংস্কৃতির সংরক্ষণ বনাম আধুনিকায়ন: কাপ্তাই বাঁধের প্লাবনভূমি থেকে শুরু করে আধুনিক বাজার অর্থনীতির ধাক্কা—পাহাড়ের মানুষ আজ একদিকে ঐতিহ্যবাহী জুম ও বনজ অধিকার রক্ষার লড়াই করছে, অন্যদিকে শিক্ষা ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নতুন গন্তব্য খুঁজছে।

​নারীর অবদান: জুমের খেত পরিচর্যা থেকে শুরু করে তাঁতের কাপড় বোনা—পাহাড়ি নারীর শ্রম ও দক্ষড়াই মূলত পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখে।

​পাহাড়ের প্রতিটি সূর্যোদয় তাদের কাছে এক নতুন সংগ্রাম—যেখানে বাঁশ, জুমের ছাই, ঝিরির পনির ঠান্ডা জল আর মাচাংয়ের রাত মিলে তৈরি হয় এক অদম্য টিকে থাকার মহাকাব্য।

বরকলে দু’টি সরকারি কমিটিতে এমপি দীপেন দেওয়ানের প্রতিনিধি মনোনীত

প্রান্তিক জনপদের সীমা পেরিয়ে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার সাফল্যের গল্প

 

ডেক্স রিপোর্ট :

রাঙামাটি ২৯৯ নম্বর সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান তাঁর পক্ষে বরকল উপজেলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কমিটিতে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিনিধি মনোনীত করেছেন।

​বরকল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর পাঠানো পৃথক দাপ্তরিক পত্রে এই মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতিতে নির্ধারিত প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কমিটির সভা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নে সার্বিক ভূমিকা রাখবেন।

​প্রেরিত চিঠির তথ্যানুযায়ী, বরকল উপজেলা ‘ত্রাণ ও সমাজসেবা কমিটি’-তে সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সঞ্চয় চাকমা।

​অন্যদিকে, পৃথক আরেকটি স্মারকের মাধ্যমে বরকল উপজেলা ‘আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন কমিটি’-তে প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে মোঃ শাহ আলম।

{“remix_data”:[],”remix_entry_point”:”challenges”,”source_tags”:[],”origin”:”unknown”,”total_draw_time”:0,”total_draw_actions”:0,”layers_used”:0,”brushes_used”:0,”photos_added”:0,”total_editor_actions”:{},”tools_used”:{“transform”:1},”is_sticker”:false,”edited_since_last_sticker_save”:true,”containsFTESticker”:false}
​মনোনীত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সঞ্চয় চাকমা জানান, “মাননীয় সংসদ সদস্য আমাকে বরকল উপজেলার ত্রাণ ও সমাজসেবা কমিটিতে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার যে গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন, তা সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করব। এলাকার সাধারণ মানুষ যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হবে।”

​মনোনয়ন সংক্রান্ত চিঠি দুটির অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও অবগতির জন্য ইতিমধ্যে বরকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।

শুভ জন্মদিন মহান নেতা এমএন লারমা : তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্তর্ভুক্তি মূলক বাংলাদেশ বিনিমার্ণের, তা বাস্তবায়ন হোক

প্রান্তিক জনপদের সীমা পেরিয়ে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার সাফল্যের গল্প

 

আজ থেকে ৮৭ বছর আগে ফুরামোন,আলুটিলা, যমচুগ মাঝখানে চেঙ্গি উপত্যকায়, বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলাধীন বুড়িঘাট মৌজার মহাপুরম (মাওরুম) গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ (এমএন) লারমার জন্ম। ডাক নাম মঞ্জু। পিতার নাম- চিত্ত কিশোর চাকমা, মাতার নাম- সুভাষিণী দেওয়ান। স্ত্রীর নাম পঙ্কজিনী চাকমা ১৯৭১ সালে বিবাহ আবদ্ধ হন। এক ছেলে জয়েস লারমা ও এক মেয়ে পারমিতা লারমা। এমএন লারমার এক বড় বোন জ্যোতি প্রভা লারমা,  বড় ভাই শুভেন্দু প্রভাস লারমা, ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। ভাই-বোন, পাহাড়ী জনপদের মরণফাঁদ নামে খ্যাত কাপ্তাই হ্রদের অতল জলরাশিতে সে গ্রামটি তলিয়ে গেছে অনেক আগেই।

এম এন লারমা জন্মগ্রহন করেছিলেন পশ্চাদপদ ও ঘুণেধরা জুম্ম সমাজের সাধারণ একটি পরিবারে; কিন্তু এই পরিবারটি রক্ষণশীল, পরনির্ভরশীল ও সামন্ত নেতৃত্বের বিরোধীতা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার রক্ষায় সাহসী ভূমিকা রাখে, তারা অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও জুম্ম যুবশক্তিকে সুশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ ও প্রচারের আন্দোলন শুরু করে;

এমএন লারমা প্রাথমিক শিক্ষা মহাপ্রুম জুনিয়র হাই স্কুলে, ম্যাট্রিক ১৯৫৮ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি কিন্তু যুবক লারমার গতিশীল চিন্তা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মুক্তির সঙ্গে পার্বত্যবাসী জনগণের মুক্তি একই তারে বাঁধা এ প্রতীতি তার ছিল। তাই ১৯৫৬ সাল থেকে এম এন লারমা ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ করেন। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যয়নের সময় ১৯৫৮ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে আই এ পাস করেন এবং কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব বিলোপের লক্ষ্যে শাসক শ্রেণীর আগ্রাসী উপনিবেশিক তাণ্ডব ও ভ্রান্তনীতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

এ সময় তিনি কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি লিফলেট প্রকাশ করেন। সচেতন ছাত্র-যুবকরা রাতের আঁধারে এই লিফলেট সর্বত্র বিলি করলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। ফলে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নিবর্তনমূলক আইনে সরকার এম এন লারমাকে গ্রেফতার করে; প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর এম এন লারমা ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬৫ সালে জেলে অন্তরীণ অবস্থায় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে সমাজকল্যাণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

১৯৬২ সালে এম এন লারমার নেতৃত্বে রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সে সময় জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজের নিকট ‘গ্রামে চলো’ শ্লোগান তুলে ধরেন। শতাব্দী প্রাচীন শাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা নিদ্রামগ্ন সমাজে ব্যাপক শিক্ষা প্রসার না ঘটালে জুম্ম জনগণকে অধিকার সচেতন করা সম্ভব নয় বলে তিনি ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সাধারণের মাঝে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি। তাঁর সেই যুগান্তকারী আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষিত যুব সমাজের অনেকেই গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। তারা একাধারে শিক্ষকতা করা ও রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

এম এন লারমা নিজেও ১৯৬৬ সালে খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালে বি এড পাস করেন এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনি হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পরে ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাশ করলে তিনি চট্টগ্রাম বার কাউন্সিলে যোগদান করেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু সে সময় বিরাজিত অস্থির ও সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে অনেক পাহাড়ী যুবক ইচ্ছে থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এ ধরনের ঘটনা যে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাতেই হয়েছে এটি ভাববার অবকাশ নেই। দেশের অন্যত্রও হাজার হাজার যুবক-ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি সুযোগ-সুবিধার অভাব ও পরিস্থিতিগত কারণে। রক্তাক্ত কিন্তু সদ্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নিয়ে এম এন লারমার ছিল আকাশ সমান স্বপ্ন ও গভীর ভাবনা। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় তাঁর সেই স্বপ্ন বারবার উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, দেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সকল প্রকারের জাতিগত-শ্রেণীগত নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটাবে। তাঁর বুকভরা আশা ছিল সংবিধানে জাতি-শ্রেণী নির্বিশেষে সকলেরই অধিকার সংরক্ষিত হবে এবং ঔপনিবেশিক অপশাসনের সকল কালাকানুন ও দমন-পীড়ন চির অবসান হবে, বিশেষ করে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক অধীনতা থেকে পাহাড়ী মানুষ পাবে মুক্তির স্বাদ।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আশা করেছিলেন, জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী শক্তির প্রতি জুম্ম জাতির শত বছরের বঞ্চনার বেদনা বুঝবেন। তারই আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি গণ পরিষদে বার বার আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারীরা তাঁর দাবির আসল মর্মার্থ না বুঝতে পেরে এবং এর পেছনে প্রচ্ছন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদ ক্রিয়াশীল আশঙ্কায় এই দাবিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। বাহাত্তরের সংবিধানে উল্লিখিত হয় যে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ জাতি ধর্ম লিঙ্গ জাতিসত্তা নির্বিশেষে ‘বাঙালি’ নামে অভিহিত হবে। কিন্তু লারমার দৃষ্টিতে ‘বাঙালি’ নামে পরিচিত মূলত সমতলবাসী জনগোষ্ঠী ভিন্ন একটি জাতি, যা ‘জুম্ম’ জাতিগোষ্ঠী থেকে নৃতাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র। কাজেই ‘জুম্ম’ জাতি কখনও ‘বাঙালি’ হতে পারে না। পার্বত্যবাসীরা যেমন ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ, তেমনি তাদের রয়েছে আলাদা ভাষা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও পৃথক জীবনাচার। তাই সেদিন তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে বের হয়ে আসেন। বারংবার তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন অনেক মন্ত্রী-নেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্ব-শাসনের কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সব আবেদন-নিবেদন ব্যর্থ হয়ে যায় শাসকবর্গের উগ্র জাতিয়তাবাদী দাম্ভিকতায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭২ সালে ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রতিষ্ঠা করলেন জুম্ম জনগণের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। তিনি ছিলেন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

সংগঠনে তিনি জুম্ম জনগণের প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক অংশকে যুক্ত করেছিলেন। এর অঙ্গসংগঠন পাহাড়ী ছাত্র সমিতি, মহিলা সমিতি, যুব সমিতির মাধ্যমে আপামর জুম্ম জনগণকে তিনি জনসংহতি সমিতির পতাকাতলে সংগঠিত করেন। ১৯৭৩ সালে জনসংহতি সমিতির সভাপতি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলে এম এন লারমা ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে চাথোয়াই রোয়াজা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দু’জনেই বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নসহ দেশের মেহনতি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পক্ষে ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। ১৯৭৪ সালে সরকারের পার্লামেন্টারী প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান করেন। বরাবরই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজেছেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নিলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়মাতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ হয়। এই পরিস্থিতিতেই বাধ্য হয়ে তিনি জুম্ম জনগণকে তাদের সমস্যা সমাধানে এবং নিজেদের আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র তুলে নেবার আহ্বান জানান। শুরু হয়, তাঁর নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন, লক্ষ্য আধিপত্যবাদী বাঙালির আগ্রাসী শক্তি ও তার প্রতি সেনা কর্তৃত্ব থেকে জুম্ম জাতির মুক্তি ও স্বায়ত্তশাসন অর্জন। কিন্তু যুদ্ধ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভোর রাতে ১০নং বিপদসংকেত চলাকালীন ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ে জনসংহতি সমিতির বিভেদপন্থী গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় তিনি খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির গভীর জঙ্গলে এক গোপন আস্তানায় নির্মমভাবে নিহত হন। সেই আক্রমণে তাঁর সঙ্গে আরো আটজন সহযোদ্ধা মারা যান।

এমএন লারমা আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন, তা-হলো আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মানে সংবিধানে আদিবাসীদের জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যগত এবং ভূমির ওপর প্রথাগত অধিকারের স্বীকৃতি। একজন চাকমা বা সাঁওতালের জাতিগত পরিচয় কখনো বাঙালি হতে পারে না- ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর মানবেন্দ্র লারমা তৎকালীন সংসদকে এই ঐতিহাসিক আর নৃবৈজ্ঞানিক সত্যটি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন তাদের সবাইকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ৫৫ বছর পর সংবিধানে সংশোধনে আবারও একই ব্যবস্থাপত্র দেওয়া থাকবে কিনা এখন প্রশ্ন? এখন সময় এসেছে সেই ভুল শোধরানো। কিন্তু সেই সময়ের যে, বাংলাদেশের জনগণ সবাই জাতি হিসেবে বাঙালি হবেন। পাকিস্তান আমলে পশ্চিমারা আমাদের বলতেন পাকিস্তানি জনগণের জাতি হচ্ছে একটিই-মুসলমান জাতি। আমরা তা মানিনি, আমরা বলেছি, আমরা জাতি হিসেবে কখনই মুসলিম না, জাতি হিসেবে আমরা অবশ্যই বাঙালি। সরকার ও সাংসদগণ সংবিধান সংশোধনের সময় জাতি ও জাতীয়তা প্রশ্নে বিশ্বের সমসাময়িক জ্ঞান থেকে বিযুক্ত হয়ে যে কাজ করেছেন তা মুর্খতারই নামান্তর; আর এটাই সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা যে বাঙালি ২৪ বছর পাকিস্তানের জাতিগত/ভাষাগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জাতিগত/ভাষাগত পরিচয় অর্জন করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বাঙালিরাই আদিবাসীদের ওপর জাতিগত/ভাষাগত নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। যে বাঙালি ২৪ বছর পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে গণতন্ত্র অর্জনের জন্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই বাঙালিরাই আদিবাসীদের ওপর সামরিক আধিপত্য বজায় রেখেছে। এক সময়কার নির্যাতিত বাঙালি অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষমতার প্রশ্নে এখন নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এটাই বোধহয় ইতিহাসের বক্রাঘাত।

আমাদের প্রত্যাশা ছিল শাসকগোষ্ঠী সংবিধানে এই সত্য মেনে নেবে যে, বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ এবং এর মধ্য দিয়ে সকল জাতির পরিচয়, অধিকার ও সংস্কৃতিকে স্থান দেবে; এভাবেই রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সবার; কিন্তু দেখি আশার সে রুটিতে লাল পিঁপড়ে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার যে বহুত্ববাদী নীতি বা বৈচিত্র্যের ভেতরে যে সংহতি তাকে নির্লজ্জভাবে পরিহার করে সংবিধানে ৯ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তা বিশিষ্ট বাঙালী জাতি’র মতো বাক্য। বাংলাদেশ কোনো একক ভাষা বা একক জাতির রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও আরো জাতির মানুষ বসবাস করে এবং তারা বাংলায় নয়, তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় কথা বলেন। সংবিধানে এদেশে বসবাসরত অন্য ভাষাভাষীর মানুষের মাতৃভাষাকেও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছে।

সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হলেও অন্য ধর্মগুলোর অস্তিত্ব স্বীকার করেছে কিন্তু দেশের অন্য জাতিসমূহের ভাষার অস্তিত্বের ব্যাপারে সংবিধান শব্দহীন এবং নিশ্চুপ। একুশ আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে। খুবই ভালো খবর; তবে যে বিষয়টি খোলাসা করা দরকার তা-হলো ২১ ফেব্রুয়ারির এই স্বীকৃতি, বাংলা ভাষার কোনো স্বীকৃতি নয়। এই স্বীকৃতি নিজের ভাষার জন্য বাঙালি জাতির ‘লড়াই’ এর স্বীকৃতি। অর্থাৎ ভাষা বা বাংলা ভাষা এখানে স্বীকৃতি পাচ্ছে না বা এতে প্রমাণ হচ্ছে না বাংলা ভাষা সারা পৃথিবীতে ‘বিশেষ’ মর্যাদার কোনো ভাষা: বরং এতে স্বীকৃতি পেয়েছে ভাষার জন্য বাঙালি জাতির লড়াই। বাঙালি জাতি এর মধ্য দিয়ে ‘মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াকু মানুষ’ হিসেবে পৃথিবীর বুকে ‘বিশেষ’ মর্যাদা পাচ্ছে। আর ভাষার প্রশ্নে এই স্বীকৃতির সত্যিকারের অনুবাদ হলো-পৃথিবীর সব মাতৃভাষাগুলোর রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া। ভাষার সঙ্গে ভাত বা জীবিকার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ, তাই আদিবাসীদের ভাষায় শিক্ষাদান বা তাদের ভাষা বিকাশে রাষ্ট্রের করণীয় নির্ধারণ আজ জরুরি।

বাংলাদেশে বসবাসরত ৫৬টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকগণ নিজ নিজ ভাষায় কথা বলেন; এসব ভাষার কোনটির কী অবস্থা তা জানার জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে দ্রুত ভাষা জরিপের কাজটি সম্পন্ন করা উচিত, তাদের ভাষা বিকাশের জন্য আদিবাসী ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আমরা হয়তো এই সত্যটিই জানিনা যে, বাংলার পরে বাংলাদেশে দ্বিতীয় কথ্য ভাষা হচ্ছে সাঁওতাল। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী বাস করেন এবং তাদের কাছে সবচেয়ে অবমাননাকর শব্দ হচ্ছে ‘উপজাতি’; আদিবাসীদের কাছে এটি ‘বাতিল’, ‘পশ্চাৎপদ’ ও ‘পরিত্যাজ্য’ একটি শব্দ। বর্তমান সংবিধানে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে তাদেরেকে অপমান করা হয়েছে; উপরন্তু বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালি ছাড়াও অপরাপর জাতির পরিচয়কে তুলে ধরতে যেয়ে একইসঙ্গে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী, সম্প্রদায় ইত্যাদি বিভিন্ন অভিধা ব্যবহার করা হয়েছে যা নিতান্তই হাস্যকর এবং এগুলোর স্পষ্ট কোনো সংজ্ঞায়ন সংবিধানে নেই। এর মধ্য দিয়ে আদিবাসী পরিচয় নির্মাণে পবিত্র সংবিধানে এক ধরনের দ্বিধা আর তালগোল পাকানো হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে আদিবাসীদের পরিচয়, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও অধিকারের স্বীকৃতি আছে। যেমন আমেরিকা, কানাডা, বলিভিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা প্রভৃতি ‘দেশে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি শুধু নয়, আদিবাসী ভূমি অধিকার ও টেরিটরির মালিকানা পর্যন্ত স্বীকৃতি পেয়েছে। কোনো কোনো দেশে উচ্চতর আদালতের রায় ও নির্দেশনা আছে আদিবাসী অধিকার রক্ষার জন্য। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে আদিবাসীদের আইনগত অধিকার ও চুক্তি রয়েছে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের মধ্যে। মালয়েশিয়ার আদিবাসী ‘ওরাং আসলি’দের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইন হয়েছিল ১৯৫৪ সালে ‘অ্যাবরিজিনাল পিপলস্ এ্যাক্ট’ নামে। এমনকি মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট আদিবাসীদের পূর্বপুরুষের অধিকৃত ভূমি রক্ষার জন্য রায় দিয়েছিল ২০০২ সালে। ফিলিপাইনে সাংবিধানিকভাবে আদিবাসীরা স্বীকৃত এবং ইনডিজিনাস পিপলস্ রাইটস অ্যাক্ট আছে তাদের। তাছাড়া আদিবাসী বিষয়ক জাতীয় কমিশন আছে ফিলিপাইনে। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও রাশিয়াতে আদিবাসীদের নিজস্ব পার্লামেন্ট আছে। গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের উপনিবেশ হলেও সেখানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি আছে। আফ্রিকার অনেক দেশে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও বৈচিত্রের স্বীকৃতি আছে। কোথাও কোথাও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। এশিয়ার মধ্যে কম্বোডিয়া, ভারত, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, নেপাল, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, লাওস প্রভৃতি দেশে আদিবাসীরা হয় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত অথবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন ও পলিসি দ্বারা স্বীকৃত। ইন্দোনেশিয়ায় তৃতীয়বার সংবিধান সংশোধনের সময় সাংবিধানিকভাবে আর্টিক্যাল ১৮ আদিবাসীদের অস্তিত্বকে সম্মান প্রদর্শন শুধু করেনি, তাদের প্রথাগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। (সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স)।

বাংলাদেশে হাজং, কোচ, বানাই, মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, উঁরাও, মুন্ডা, খাসিয়া, মণিপুরী, খুমি, খিয়াং, লুসাই, বম, ম্রো ও রাজবংশীসহ বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করেন। তাঁরা তাঁদের স্বকীয়তা, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য দিয়ে আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন। ভুলে গেলে ভুল হবে যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ সকল আদিবাসীদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবদান। নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে আদিবাসী জনগণ যাতে সকলের মত সমান মর্যাদা ভোগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আমরা মনে করেছিলাম, ৫৪/৫৫ বছরে ভূ-রাজনীতির গতি প্রকৃতি যেমন পাল্টেছে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, মন-রুচিও অনেক অনেক পাল্টেছে, তাই এখন যে সংবিধান রচিত হবে সংবিধান সংশোধন হবে, তা কেবল ধর্ম নিরপেক্ষ হলেই চলবে না, একইসঙ্গে ভাষা নিরপেক্ষ, জাতি নিরপেক্ষ ও লিঙ্গ নিরপেক্ষ হতে হবে। ভুলে গেলে ভুল হবে যে, বাঙালির একক জাতীয়তাবাদের দেমাগ ইতোপূর্বে রাষ্ট্রীয় শান্তির ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যাই কেবল পয়দা করেছে, কোনো সমাধান বদলাতে পারেনি। শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এরকম ধারণা কাজ করে যে একটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলতে না পারলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার হয় না। আমরা মনে করি একক জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য একটি ভুল প্রেমিজ; বরং একটি দেশের জনবিন্যাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও কৃষ্টির বহুমুখী বিচিত্র রূপই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে; এটিই বৈচিত্রের ঐকতান বা বহুত্ববাদ বিউটি অব ডেমোক্রেসি। একক জাতিসুলভ দাম্ভিকতা বাদ দিয়ে দ্রুত এই সত্য বুঝতে পারলে রাষ্ট্রের জন্য বরং ভালো যে, বাংলাদেশ কোনো এক জাতি এক ভাষা আর এক ধর্মের রাষ্ট্র নয়; এটি অবশ্যই একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের রাষ্ট্র: সংবিধানেও এর ইঙ্গিত আছে কারণ সংবিধানে দেশের নাম পিপলস রিপাবলিক বলা হয়েছে, বেঙ্গলি রিপাবলিক বলা হয়নি; আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবি থেকে আমরা তাই এক চুলও সরে আসতে পারি না। খুবই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন যে, বিচ্ছিন্নতবাদী আসলে কারা? যারা সংবিধানের ভেতর তাদের যথাযথ স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে তারা? নাকি যারা এই স্বীকৃতি না দিয়ে তাদেরকে দূরে ঠেলছে তারা? আমরা মনে করি সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, আমরা চাইলে আবারো একে সংশোধন করতে পারি, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীও তাই বলেছেন। অন্তর্ভুক্তিমুলক বাংলাদেশ নিমার্ণে এবং আমরা সবাই বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে সেই আশায় জাতীয়তা পরিচয়ে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিসমূহ আবারো তুলে ধরছি:

দ্বিধা দোলাচাল আর অস্পষ্টতার কুয়াশা সরিয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে বসবাসরত ৫৬টির অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্রপূর্ণ দেশ’- এই বাক্যের সংযোজন করা হোক।

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিধিসহ অপরাপর সাম্প্রদায়িক শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদসমূহ সংশোধন করে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংবিধানের সংযোজন করা হোক- ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি বিশেষ শাসিত আদিবাসী অঞ্চলের মর্যাদা পাবে।’

তিন পার্বত্য জেলার সংসদীয় আসনসমূহসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদের আসন ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হোক। আইএলও-এর ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশন এবং ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। সাংবিধানিকভাবে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।

ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতামুখী অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে বলতে চাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার জন্য এবং আদিবাসীদের সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিকে আবারো নতুন করে ভাবুন। সংবিধানের ত্রুটিপূর্ণ সংশোধনের প্রতিক্রিয়া আদিবাসীরা দেখাতে শুরু করেছেন, গণমাধ্যমে আমরা তার প্রতিফলন দেখছি। ৩০ লক্ষ মানুষের মনে যে ক্ষোভ আর হতাশা সঞ্চারিত হচ্ছে, দ্রুত তা আমলে না নিলে এখান থেকে অতীতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে, যা আমরা কেউই চাইনা। আমারা এখনও মনে করি বাংলাদেশ একটি বহু জাতির সম্মানজনক অংশীদারিত্বের রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বপ্নকে ধারণ করতে সক্ষম হবে।

আমরা চাই দেশে বসবাসকারী সকল জাতি সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন করে রচিত হোক আগামীর সংবিধান। এমএন লারমা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন যে কথা বলেছিলেন সংসদে আমাদের দেশে সকল নাগরিকদের সম-মযর্দার, সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা তার ব্যবস্থা যদি বর্তমান সরকার ধারণ করে সকলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

 

লেখক :

ইন্টু মনি তালুকদার,

সাধারণ সম্পাদক,

এমএন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম,

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল।

×