পাহাড়ে বৈচিত্র্যের উৎসবে সম্প্রীতির বন্ধন, বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-চাংক্রানের আমেজ
মথি ত্রিপুরা, রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
চৈত্রের শেষ প্রহর আর নতুন বছরের আগমনী বার্তায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়। প্রকৃতির পুরনো ক্লান্তি ঝরে গিয়ে নতুন কুঁড়ির উচ্ছ্বাসে সেজে উঠেছে অরণ্য। আর এই সময়টাতেই পাহাড়ি জনপদ জুড়ে শুরু হয় নানা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব—বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রানসহ বিভিন্ন আয়োজন। নাম ভিন্ন হলেও এর মর্মবাণী এক—সম্প্রীতি, মৈত্রী আর আনন্দের মিলনমেলা।
আজ (১১ এপ্রিল) রোজ শনিবার সরেজমিনে দেখা যায় যে, বান্দরবানের রুমা উপজেলায় অন্যান্য বছরে ন্যায় এই বছরেও রুমা সাংগু নদী চড়ে প্যান্ডেল নির্মাণে ব্যস্ততা দৃশ্য দেখা মিলেছে এবং আশপাশের এলাকাগুলোতেও মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব ‘সাংগ্রাই’কে কেন্দ্র করে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে পুরাতনকে বিদায় দিয়ে চলছে প্রস্তুতি।বাজারগুলোতে বেড়েছে কেনাকাটার ভিড়, ঘরে ঘরে চলছে সাজসজ্জা আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের তোড়জোড়। কেনাকাটায় ব্যস্ততা স্থানীয় বাজারগুলোতে মারমা তরুণ-তরুণীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘থামি’ ও ‘আঙ্গি’ কেনায় ব্যস্ত তারা। পাশাপাশি চাকমাদের ‘পিনোন-হাদি’ এবং ত্রিপুরাদের ‘রিনাই-রিসা’ও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
দর্জিদের ব্যস্ত সময় উৎসবকে ঘিরে দর্জিদেরও বেড়েছে কাজের চাপ। নতুন ডিজাইন ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরিতে দিন-রাত কাজ করছেন দর্জিরা।
সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি উৎসব উপলক্ষে চলছে পিঠা তৈরির আয়োজন, লোকজ খেলাধুলার প্রস্তুতি এবং জলকেলি অনুষ্ঠানের মহড়া। তরুণ-তরুণীরা নৃত্য, সংগীত ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। উৎসবের দিনপঞ্জি সাধারণত তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের শুরু হয় ১২ এপ্রিল ‘ফুল বিজু’ বা ‘বৈসু’ দিয়ে। এদিন ভোরে তরুণ-তরুণীরা ফুল সংগ্রহ করে নদী বা হ্রদের জলে উৎসর্গ করে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।
১৩ এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তি, যা ‘মূল বিজু’ হিসেবে পালিত হয়। এই দিনে ঘরে ঘরে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাঁজন’, যা বহু প্রকার সবজির সমন্বয়ে তৈরি এক বিশেষ পদ। আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের আপ্যায়নে মুখর থাকে প্রতিটি পরিবার। ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিনটি কাটে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ গ্রহণ এবং সামাজিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে। এদিন মারমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন ‘জলকেলি’, যেখানে পানি ছিটিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।

পাঁজন: ঐতিহ্যের স্বাদ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘পাঁজন’ বা ‘পাঁচন’। বাঁশকোড়ল, পাহাড়ি কচু, শিম, কাঁঠালের বিচিসহ নানা সবজির সমন্বয়ে তৈরি এই খাবার শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। অনেকে এতে শুটকি বা সিদল ব্যবহার করে ভিন্ন স্বাদ এনে থাকেন। লোকজ ঐতিহ্যের ছোঁয়া উৎসব ঘিরে পাহাড়জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন লোকজ ক্রীড়া ও নৃত্য। ত্রিপুরাদের ‘গরাইয়া নৃত্য’, চাকমাদের ‘ঘিলা খেলা’ ও ‘বলি খেলা’, ম্রো সম্প্রদায়ের বাঁশি নৃত্য উৎসবে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
পর্যটনের আকর্ষণ এখন আর এই উৎসব শুধু পাহাড়িদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন এই উৎসব উপভোগ করতে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রীতির বার্তা চাকমাদের ‘বিজু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিষু’ কিংবা ম্রোদের ‘চাংক্রান’—নামের ভিন্নতায় বিভ্রান্তি থাকলেও উৎসবের মূল সুর একটাই—শান্তি ও সম্প্রীতি। পাহাড়ের মানুষ নতুন বছরে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রত্যাশা করে।
১২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই উৎসব শেষে পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে একটাই প্রত্যাশা—আগামী দিনগুলো হোক ঝরনার জলের মতো নির্মল আর সবুজ অরণ্যের মতো প্রাণবন্ত।














