| ১৯ মে ২০২৬
শিরোনাম:

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

 

এম এস শ্রাবণ মাহমুদ :

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাটের প্রস্তুতি জোরেশোরে চললেও এবার অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর ইজারামূল্যে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। স্থায়ী হাটগুলো থেকে ভালো রাজস্ব এলেও অস্থায়ী হাটে আশানুরূপ দর না পাওয়ায় রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরীর তিনটি স্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়ে এবার প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করছে সংস্থাটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাগরিকা পশুর হাট ৮ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা নিয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী। মুরাদপুরের বিবিরহাট ইজারা হয়েছে ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ২০২৫ সালে একই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

এছাড়া পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৬ টাকায়।
তবে অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে চিত্র ভিন্ন। কর্ণফুলী অস্থায়ী পশুর হাটে সর্বোচ্চ ২ কোটি ১২ লাখ টাকা দর উঠলেও মুসলিমাবাদ মাঠে পাওয়া গেছে মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ওয়াজেদিয়া হাটে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালের পর এবারই অস্থায়ী হাটে সবচেয়ে কম দর পাওয়া গেছে।

চসিকের অনুমোদিত ২২টি হাট-বাজারের মধ্যে ৬টি পশুর হাট থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। তবে এবার অস্থায়ী হাটে কম দর, কোথাও টেন্ডার না হওয়া এবং খাস কালেকশন নিয়ে বিতর্কের কারণে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইজারাদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইনে পশু বিক্রি বৃদ্ধি, ভাগাভাগি করে কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা এবং খামার থেকে সরাসরি পশু কেনার কারণে প্রচলিত হাটের ওপর নির্ভরতা কমেছে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় অবৈধ হাট বসানোয় বৈধ হাটে ক্রেতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা, সিসিটিভি, কর্মচারী নিয়োগ ও অবকাঠামো তৈরির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইজারাদারদের খরচও বেড়েছে।

সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদার ফজলে আলিম চৌধুরী বলেন, “৮ কোটি টাকা দিয়ে হাট নিয়েছি। এখন সেই টাকা উঠবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। উত্তরবঙ্গ থেকে পর্যাপ্ত গরু না এলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।”
এদিকে খাস কালেকশন নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, নির্ধারিত মূল্যে ইজারাদার না পাওয়ার অজুহাতে কয়েক বছর ধরে চসিক ইজারার পরিবর্তে খাস কালেকশনে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এতে হাসিল আদায়, ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, অবৈধ পশুর হাটের কারণে প্রতিবছর রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি যানজট, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়। তাই এবার অবৈধ হাট বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে চসিক।

তিনি জানান, অনুমোদিত হাটগুলোতে জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ, সিসিটিভি ক্যামেরা, পশু চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, গোখাদ্য সরবরাহ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলের ব্যবস্থা থাকবে।

চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, “অনুমোদিত হাটের বাইরে কোথাও পশুর বাজার বসতে দেওয়া হবে না। অবৈধ হাট উচ্ছেদে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।”
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন অনুযায়ী এবার চসিক এলাকায় ৩টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। অস্থায়ী হাটগুলো( ১৯ মে থেকে-( ২৮ মে) পর্যন্ত ১০ দিনের জন্য পরিচালিত হবে।

জেলা প্রশাসনের শর্ত অনুযায়ী, প্রধান সড়ক থেকে অন্তত ১০০ গজ দূরে হাট বসাতে হবে এবং যান চলাচলে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ হাটে নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করা গেলেও অবৈধ হাট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চসিকের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়িতে বিজিবির বিশেষ অভিযানে ৯০ হাজার টাকার অবৈধ সিগারেট জব্দ

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

 

সিএইচটি বার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ বিদেশী সিগারেট জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সোমবার (১৮ মে)২৬ খ্রিঃ রাতে উপজেলার উগলছড়ি ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের (২৭ বিজিবি) একটি দল এই অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে মালামাল ফেলে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

বিজিবি সুত্রে জানা যায় – গোয়েন্দা’র -গোপন
তথ্যের ভিত্তিতে মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের (২৭ বিজিবি) অধিনায়কের নির্দেশক্রমে রাত আনুমানিক ৯ঃ০০টার সময় উগলছড়ি ব্রিজ এলাকায় বিশেষ অভিযানে নামে বিজিবির একটি টহল দল।

নায়েব সুবেদার মোঃ আবুল কালামের নেতৃত্বে দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দূর থেকে চোরাকারবারিরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে যায়।

ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার এড়াতে মাথায় বহনকৃত প্লাস্টিকের বস্তাগুলো রাস্তায় ফেলে রেখে দ্রুত দৌড়ে অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়।​ পরবর্তীতে বিজিবি টহল দল ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করে। বস্তাগুলো তল্লাশি করে ভেতরে ৩০ কার্টুন “ESSE Lights” নামক বিদেশী সিগারেট জব্দ করে।

বিজিবি জানিয়েছে, জব্দকৃত এই সিগারেটের আনুমানিক বাজার মূল্য ৯০,০০০ (নব্বই হাজার) টাকা।

এই বিষয়ে মারিশ্যা জোন (২৭ বিজিবি)র জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, (পিএসসি) জানান, মারিশ্যা জোনের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সব সময়ই অত্যন্ত কঠোর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।​

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিতে বিভিন্ন অভিনব ও কৌশলী পদ্ধতিতে চোরাচালানের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে।
এই তৎপরতা রুখে দিতে মারিশ্যা জোন সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত আভিযানিক টহল জোরদার করা হয়েছে।

দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এবং চোরাচালান দমনে বিজিবির এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি এই আশা ব্যক্ত করেন।

সাজেকে সেনাবাহিনীর কতৃর্ক বিনামুল্য চিকিৎসা সেবা ও ঔষুধ বিতরণ

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

 

সিএইচটি বার্তা ডেক্স রিপোর্ট :

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার ৩৬নং সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট সেনা জোনের উদ্যোগে গঙ্গারাম এমএ গাফফার বেসামরিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দুস্থ অসহায় বয়স্ক মানুষের মাঝে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছে বাঘাইহাট জোন।

সোমবার ১৮ মে ইংরেজি তারিখে বাঘাইহাট জোনের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এতে সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা মেলাছড়া, দুলুছড়ি, কজোইছড়িসহ বিভিন্ন গ্রামের হতে দরিদ্র, দুস্থ পাহাড়ী ও বাঙালি আনুমানিক ২০০ শতাধিক পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ প্রদান করেছেন।

ঔষধ বিতরণ কালে উপস্তিত ছিলেন সাজেক ইউনিয়নের
৫নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য পরিচয় চাকমা (মেম্বার) এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জনসাধারণের চিকিৎসার কথা ভেবে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের এই উদ্যোগ। সবাইকে একত্রিত করে দেওয়া সম্ভব নয় বিধায় বিগত দিনে বাঘাইহাট জোনের আওতাধীন দুর্গম ভুয়াছড়ি, মাসালং  ১৪ কিলো, গঙ্গারাম এবং বাঘাইহাট এলাকায় চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ মুশফিক এলাকায় *এমএ গাফফার বেসামরিক প্রাথমিক বিদ্যালয়* মাঠে পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয় জনসাধারণ এর মাঝে চিকিৎসা সেবার আয়োজন করেছে।।এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে বলে বাঘাইহাট জোন আশাব্যাক্ত করেন।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুইজন অভিজ্ঞ মেডিকেল অফিসার উপস্থিত ছিলেন  তারা হলেন ক্যাপ্টেন শাহনেওয়াজ সুশান আরএমও, এবং ক্যাপন্টেন মো: হাবিবুল্লাহ হাবির পারভেজ (আরএমও)।

পাহাড়ে জুমের গন্ধ, মেঘের বসতি এবং একটি আত্মপরিচয়ের লড়াই

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

 

ছন্দ সেন চাকমা :

​ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখলেই প্রথমে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা হলো—কুয়াশা মোড়ানো পাহাড়ের ঢালে এক কিশোরী জুমের ধান কাটছে, আর দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির সুর। এই পাহাড়, এই অরণ্য কেবল কিছু ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নয়; এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি যূথবদ্ধ জীবনদর্শন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রিনে চোখ রাখলে সেই পাহাড়ের গায়ে এক ধরনের কৃত্রিম ও বিদ্বেষপূর্ণ কালির দাগ দেখতে পাই। ইতিহাস, নৃ-বিজ্ঞান আর মানবিক বোধকে পাশ কাটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দাদের ‘বহিরাগত’ প্রমাণ করার এক অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একজন ডকুমেন্টারি নির্মাতা ও আলোকচিত্রী হিসেবে যখন আমি পাহাড়ের বুক চিরে ইতিহাসের আলো খুঁজি, তখন শব্দ বেশ ধারী রাম, শ্যাম, যদু,মধু-এর মতো চিন্তকদের লেখনী আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

আজ সময় এসেছে রাজনৈতিক বা আবেগঘটিত চশমা সরিয়ে, সাহিত্যের খেরোখাতায় আর ইতিহাসের অমোঘ দলিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ করার।

​১. জুমের ঐতিহ্য ও কার্পাস মহলের আদি ইতিকথা ——-

​ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, সমতলের রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন আজকের এই কাঠামোগত রূপ নেয়নি, তখন থেকেই পাহাড়ের ঢালে জীবন ডানা মেলেছিল। পাহাড়ের আদিম কৃষিপদ্ধতি ‘জুম চাষ’ কেবল জীবিকা নয়, এটি পাহাড়ের ১১টি নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বের মূল ভিত্তি। মোগল ও ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দলিলে এই অঞ্চলকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘কার্পাস মহল’ হিসেবে। তুলা আর জুমের ফসলে সমৃদ্ধ এই জনপদে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলো গড়ে তুলেছিল নিজস্ব সামাজিক ও বিচারিক কাঠামো—যার প্রতীকী রূপ আজও টিকে আছে রাজা বা সার্কেল চিফ প্রথার মাধ্যমে।

​নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্র নামক আধুনিক ধারণার বহু আগেই এই পাহাড়ি সমাজগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বাধীন। ক্যামেরা হাতে যখন আমি কোনো প্রবীণ জুমচাষির বলিরেখা পড়া মুখের ছবি তুলি, তখন মনে হয়—ঐতিহ্যের এই প্রাচীন স্বাক্ষর কোনো আধুনিক আইন দিয়ে মুছে ফেলা অসম্ভব।

​২. মাইগ্রেশনের কাঁটাতার বনাম মাটির অধিকার —–

​একটি বহুল চর্চিত ও খণ্ডিত যুক্তি হলো—পাহাড়ের মানুষ তো তিব্বত বা মায়ানমার থেকে এসেছে, তবে তারা ‘আদিবাসী’ হয় কী করে?

​নৃবৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করতেই এমন প্রশ্ন তোলা হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত স্থানান্তরেরই ইতিহাস। পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের মানুষই ভূগর্ভ থেকে আচমকা গজিয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক আইন (ILO Convention 107 & 169) এবং নৃবিজ্ঞানের স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘আদিবাসী’ (Indigenous) নির্ধারণের মূল মাপকাঠি হলো—কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো বা ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম হওয়ার আগে থেকে কারা সেখানে বসবাস করছে।

​১৭৬০ সালে ব্রিটিশরা যখন চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারও বহু আগে থেকে এই জনপদ পাহাড়িদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে ছিল। চাকমা রাজবংশের ইতিহাস প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। ১৮৬০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস’ জেলা ঘোষণা কিংবা ১৯০০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন’ প্রমাণ করে যে, সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এই জনজীবন ও ভূমি-ব্যবস্থাকে ব্রিটিশ শাসকেরাও বিশেষ মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছিল। সুতরাং, আধুনিক বাংলাদেশের সীমানা বা মানচিত্র আঁকার বহু আগেই তারা এই মাটির সন্তান, এই পাহাড়ের ভূমি-পুত্র।

​৩. সাংবিধানিক শব্দের মারপ্যাঁচ ও আত্মপরিচয়ের সংকট ——

​২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এই জনগোষ্ঠীগুলোকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো কৌশলী শব্দচয়নে তাদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে গেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক ভিত্তি এবং মাটির ইতিহাসকে তো অস্বীকার করা যায় না।

​‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল একটি জাতিগত তকমা নয়; এটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ভূমির অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার এক আন্তর্জাতিক আইনি রক্ষাকবচ। ক্যামেরার ফ্রেমে যখন লুপ্তপ্রায় কোনো ভাষার শেষ গায়কের অবয়ব ধরে রাখি, তখন বুঝি—এই আইনি সুরক্ষার অভাব কীভাবে একটি সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্র তাদের যে নামেই ডাকুক, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তাদের আদিবাসিত্বের পক্ষে আজীবন সাক্ষ্য দেবে।

​৪. ভার্চুয়াল জগতের বিষবাষ্প ও আমাদের দায় ——

​বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষদের প্রতি এক ধরনের তীব্র বিদ্বেষ ও অবমাননাকর মন্তব্য করার প্রবণতা দেখা যায়। না জেনে, না পড়ে কাউকে ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং এক ধরনের বর্ণবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

একটি বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্ন সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানানোই একজন সুনাগরিকের প্রথম পাঠ হওয়া উচিত। গালাগালি বা ট্রোলিং করে কোনো জাতির হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে ফেসবুকের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না। এখানে প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক উদারতা এবং সঠিক ইতিহাস চর্চা।

সহাবস্থানের সুর :

​পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড বা পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্র নয়; এটি নান্দনিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। পাহাড়, নদী, ঝরনা আর জুমের প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে পাহাড়ের মানুষের কান্না, হাসির আর লড়াইয়ের গল্প। ​নিজের দেশের ভেতরের এই বর্ণিল বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা মানে নিজের দেশের ইতিহাসকেই খণ্ডিত করা। প্রকৃত দেশপ্রেম ঘৃণা ছড়ানোয় নয়, বরং বৈচিত্র্যকে উদযাপনের মধ্যে নিহিত থাকে। পাহাড় ও সমতলের মাঝে দূরত্বের যে দেওয়াল তোলার চেষ্টা চলছে, তা ভাঙতে হবে পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং পরম সহিষ্ণুতার মাধ্যমে। আদিবাসীদের অধিকার ও পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই কেবল আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। লেন্সের ওপার থেকে আমি সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখি।

 

​(লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রীতিনীতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করা একজন ভিডিও ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার।)

×