| ১৯ মে ২০২৬
শিরোনাম:

বাঘাইছড়ির মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান ব্যাহত

বাঘাইছড়ির মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান ব্যাহত

 

আনোয়ার হোসেন, ‎বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি :

‎রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে অবস্থিত মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম ঝুঁকির মধ্য দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিদ্যালয়ের ৬ কক্ষবিশিষ্ট মূল ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে উপজেলা প্রশাসন সিলগালা করে দেওয়ার পরও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বারান্দা ও পাশের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

‎সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কয়েকটি শ্রেণির পাঠদান চলছে খোলা বারান্দায়। এছাড়া বিদ্যালয়ের আরেকটি ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে একটি কক্ষে পর্দা টানিয়ে একই সময়ে দুটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। ‎

‎বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুর শুকুর বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ভবনটিতে গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও প্রকৌশলীরা ভবনটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে ভবনটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। আমরা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা পুনর্নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।” ‎

‎বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, “রুম সংকটের কারণে একই কক্ষে পর্দা দিয়ে দুই শ্রেণির ক্লাস নিতে হচ্ছে। একসঙ্গে দুটি শ্রেণির পাঠদান চলায় শব্দের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে।” ‎

‎বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, “বৃষ্টির সময় আমাদের কে বারান্দা থেকে অফিস কক্ষে নিয়ে ক্লাস করানো হয়। তখন অনেক কষ্ট হয় এবং ঠিকমতো পড়াশোনা করা যায় না।” ‎

‎বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাজী নিজাম উদ্দিন বাবু বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের মূল্যায়নে মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমানে পাশের একটি ভবনের ছোট কক্ষ ও বারান্দায় অস্থায়ীভাবে পাঠদান চললেও এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে। তাই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি দ্রুত পুনর্নির্মাণে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

‎এদিকে অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যেই সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ‎

‎এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার সঞ্চয়ন চাকমা বলেন, ‎“মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের পশ্চিম পাশ দেবে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে ইউএনও মহোদয়কে অবহিত করি। পরে ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ভবনটিতে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ‎বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মহোদয়কেও জানানো হয়েছে। প্রকৌশলীর চূড়ান্ত মতামত অনুযায়ী ভবনটিতে ক্লাস না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের পাশের খালি জায়গায় ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ ফান্ডের আওতায় অস্থায়ী ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়িতে বিজিবির বিশেষ অভিযানে ৯০ হাজার টাকার অবৈধ সিগারেট জব্দ

বাঘাইছড়ির মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান ব্যাহত

 

সিএইচটি বার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ বিদেশী সিগারেট জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সোমবার (১৮ মে)২৬ খ্রিঃ রাতে উপজেলার উগলছড়ি ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের (২৭ বিজিবি) একটি দল এই অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে মালামাল ফেলে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

বিজিবি সুত্রে জানা যায় – গোয়েন্দা’র -গোপন
তথ্যের ভিত্তিতে মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের (২৭ বিজিবি) অধিনায়কের নির্দেশক্রমে রাত আনুমানিক ৯ঃ০০টার সময় উগলছড়ি ব্রিজ এলাকায় বিশেষ অভিযানে নামে বিজিবির একটি টহল দল।

নায়েব সুবেদার মোঃ আবুল কালামের নেতৃত্বে দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দূর থেকে চোরাকারবারিরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে যায়।

ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার এড়াতে মাথায় বহনকৃত প্লাস্টিকের বস্তাগুলো রাস্তায় ফেলে রেখে দ্রুত দৌড়ে অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়।​ পরবর্তীতে বিজিবি টহল দল ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করে। বস্তাগুলো তল্লাশি করে ভেতরে ৩০ কার্টুন “ESSE Lights” নামক বিদেশী সিগারেট জব্দ করে।

বিজিবি জানিয়েছে, জব্দকৃত এই সিগারেটের আনুমানিক বাজার মূল্য ৯০,০০০ (নব্বই হাজার) টাকা।

এই বিষয়ে মারিশ্যা জোন (২৭ বিজিবি)র জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, (পিএসসি) জানান, মারিশ্যা জোনের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সব সময়ই অত্যন্ত কঠোর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।​

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিতে বিভিন্ন অভিনব ও কৌশলী পদ্ধতিতে চোরাচালানের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে।
এই তৎপরতা রুখে দিতে মারিশ্যা জোন সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত আভিযানিক টহল জোরদার করা হয়েছে।

দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এবং চোরাচালান দমনে বিজিবির এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি এই আশা ব্যক্ত করেন।

সাজেকে সেনাবাহিনীর কতৃর্ক বিনামুল্য চিকিৎসা সেবা ও ঔষুধ বিতরণ

বাঘাইছড়ির মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান ব্যাহত

 

সিএইচটি বার্তা ডেক্স রিপোর্ট :

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার ৩৬নং সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট সেনা জোনের উদ্যোগে গঙ্গারাম এমএ গাফফার বেসামরিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দুস্থ অসহায় বয়স্ক মানুষের মাঝে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছে বাঘাইহাট জোন।

সোমবার ১৮ মে ইংরেজি তারিখে বাঘাইহাট জোনের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এতে সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা মেলাছড়া, দুলুছড়ি, কজোইছড়িসহ বিভিন্ন গ্রামের হতে দরিদ্র, দুস্থ পাহাড়ী ও বাঙালি আনুমানিক ২০০ শতাধিক পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ প্রদান করেছেন।

ঔষধ বিতরণ কালে উপস্তিত ছিলেন সাজেক ইউনিয়নের
৫নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য পরিচয় চাকমা (মেম্বার) এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জনসাধারণের চিকিৎসার কথা ভেবে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের এই উদ্যোগ। সবাইকে একত্রিত করে দেওয়া সম্ভব নয় বিধায় বিগত দিনে বাঘাইহাট জোনের আওতাধীন দুর্গম ভুয়াছড়ি, মাসালং  ১৪ কিলো, গঙ্গারাম এবং বাঘাইহাট এলাকায় চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ মুশফিক এলাকায় *এমএ গাফফার বেসামরিক প্রাথমিক বিদ্যালয়* মাঠে পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয় জনসাধারণ এর মাঝে চিকিৎসা সেবার আয়োজন করেছে।।এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে বলে বাঘাইহাট জোন আশাব্যাক্ত করেন।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুইজন অভিজ্ঞ মেডিকেল অফিসার উপস্থিত ছিলেন  তারা হলেন ক্যাপ্টেন শাহনেওয়াজ সুশান আরএমও, এবং ক্যাপন্টেন মো: হাবিবুল্লাহ হাবির পারভেজ (আরএমও)।

পাহাড়ে জুমের গন্ধ, মেঘের বসতি এবং একটি আত্মপরিচয়ের লড়াই

বাঘাইছড়ির মারিশ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান ব্যাহত

 

ছন্দ সেন চাকমা :

​ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখলেই প্রথমে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা হলো—কুয়াশা মোড়ানো পাহাড়ের ঢালে এক কিশোরী জুমের ধান কাটছে, আর দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির সুর। এই পাহাড়, এই অরণ্য কেবল কিছু ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নয়; এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি যূথবদ্ধ জীবনদর্শন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রিনে চোখ রাখলে সেই পাহাড়ের গায়ে এক ধরনের কৃত্রিম ও বিদ্বেষপূর্ণ কালির দাগ দেখতে পাই। ইতিহাস, নৃ-বিজ্ঞান আর মানবিক বোধকে পাশ কাটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দাদের ‘বহিরাগত’ প্রমাণ করার এক অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একজন ডকুমেন্টারি নির্মাতা ও আলোকচিত্রী হিসেবে যখন আমি পাহাড়ের বুক চিরে ইতিহাসের আলো খুঁজি, তখন শব্দ বেশ ধারী রাম, শ্যাম, যদু,মধু-এর মতো চিন্তকদের লেখনী আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

আজ সময় এসেছে রাজনৈতিক বা আবেগঘটিত চশমা সরিয়ে, সাহিত্যের খেরোখাতায় আর ইতিহাসের অমোঘ দলিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ করার।

​১. জুমের ঐতিহ্য ও কার্পাস মহলের আদি ইতিকথা ——-

​ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, সমতলের রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন আজকের এই কাঠামোগত রূপ নেয়নি, তখন থেকেই পাহাড়ের ঢালে জীবন ডানা মেলেছিল। পাহাড়ের আদিম কৃষিপদ্ধতি ‘জুম চাষ’ কেবল জীবিকা নয়, এটি পাহাড়ের ১১টি নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বের মূল ভিত্তি। মোগল ও ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দলিলে এই অঞ্চলকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘কার্পাস মহল’ হিসেবে। তুলা আর জুমের ফসলে সমৃদ্ধ এই জনপদে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলো গড়ে তুলেছিল নিজস্ব সামাজিক ও বিচারিক কাঠামো—যার প্রতীকী রূপ আজও টিকে আছে রাজা বা সার্কেল চিফ প্রথার মাধ্যমে।

​নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্র নামক আধুনিক ধারণার বহু আগেই এই পাহাড়ি সমাজগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বাধীন। ক্যামেরা হাতে যখন আমি কোনো প্রবীণ জুমচাষির বলিরেখা পড়া মুখের ছবি তুলি, তখন মনে হয়—ঐতিহ্যের এই প্রাচীন স্বাক্ষর কোনো আধুনিক আইন দিয়ে মুছে ফেলা অসম্ভব।

​২. মাইগ্রেশনের কাঁটাতার বনাম মাটির অধিকার —–

​একটি বহুল চর্চিত ও খণ্ডিত যুক্তি হলো—পাহাড়ের মানুষ তো তিব্বত বা মায়ানমার থেকে এসেছে, তবে তারা ‘আদিবাসী’ হয় কী করে?

​নৃবৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করতেই এমন প্রশ্ন তোলা হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত স্থানান্তরেরই ইতিহাস। পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের মানুষই ভূগর্ভ থেকে আচমকা গজিয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক আইন (ILO Convention 107 & 169) এবং নৃবিজ্ঞানের স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘আদিবাসী’ (Indigenous) নির্ধারণের মূল মাপকাঠি হলো—কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো বা ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম হওয়ার আগে থেকে কারা সেখানে বসবাস করছে।

​১৭৬০ সালে ব্রিটিশরা যখন চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারও বহু আগে থেকে এই জনপদ পাহাড়িদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে ছিল। চাকমা রাজবংশের ইতিহাস প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। ১৮৬০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস’ জেলা ঘোষণা কিংবা ১৯০০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন’ প্রমাণ করে যে, সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এই জনজীবন ও ভূমি-ব্যবস্থাকে ব্রিটিশ শাসকেরাও বিশেষ মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছিল। সুতরাং, আধুনিক বাংলাদেশের সীমানা বা মানচিত্র আঁকার বহু আগেই তারা এই মাটির সন্তান, এই পাহাড়ের ভূমি-পুত্র।

​৩. সাংবিধানিক শব্দের মারপ্যাঁচ ও আত্মপরিচয়ের সংকট ——

​২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এই জনগোষ্ঠীগুলোকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো কৌশলী শব্দচয়নে তাদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে গেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক ভিত্তি এবং মাটির ইতিহাসকে তো অস্বীকার করা যায় না।

​‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল একটি জাতিগত তকমা নয়; এটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ভূমির অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার এক আন্তর্জাতিক আইনি রক্ষাকবচ। ক্যামেরার ফ্রেমে যখন লুপ্তপ্রায় কোনো ভাষার শেষ গায়কের অবয়ব ধরে রাখি, তখন বুঝি—এই আইনি সুরক্ষার অভাব কীভাবে একটি সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্র তাদের যে নামেই ডাকুক, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তাদের আদিবাসিত্বের পক্ষে আজীবন সাক্ষ্য দেবে।

​৪. ভার্চুয়াল জগতের বিষবাষ্প ও আমাদের দায় ——

​বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষদের প্রতি এক ধরনের তীব্র বিদ্বেষ ও অবমাননাকর মন্তব্য করার প্রবণতা দেখা যায়। না জেনে, না পড়ে কাউকে ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং এক ধরনের বর্ণবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

একটি বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্ন সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানানোই একজন সুনাগরিকের প্রথম পাঠ হওয়া উচিত। গালাগালি বা ট্রোলিং করে কোনো জাতির হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে ফেসবুকের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না। এখানে প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক উদারতা এবং সঠিক ইতিহাস চর্চা।

সহাবস্থানের সুর :

​পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড বা পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্র নয়; এটি নান্দনিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। পাহাড়, নদী, ঝরনা আর জুমের প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে পাহাড়ের মানুষের কান্না, হাসির আর লড়াইয়ের গল্প। ​নিজের দেশের ভেতরের এই বর্ণিল বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা মানে নিজের দেশের ইতিহাসকেই খণ্ডিত করা। প্রকৃত দেশপ্রেম ঘৃণা ছড়ানোয় নয়, বরং বৈচিত্র্যকে উদযাপনের মধ্যে নিহিত থাকে। পাহাড় ও সমতলের মাঝে দূরত্বের যে দেওয়াল তোলার চেষ্টা চলছে, তা ভাঙতে হবে পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং পরম সহিষ্ণুতার মাধ্যমে। আদিবাসীদের অধিকার ও পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই কেবল আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। লেন্সের ওপার থেকে আমি সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখি।

 

​(লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রীতিনীতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করা একজন ভিডিও ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার।)

×