পাহাড়ের পবিত্র বুকে দুই রাত : বহিরা গাছের ছায়ায় আদিবাসী জীবন ও জুমের রূপকথা
ছন্দ সেন চাকমা, বিলাইছড়ি থেকে ফিরে :
১০ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা নামার আগেই আকাশটা কালো হয়ে এলো। শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আমরা তখন রাঙামাটির এক প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামের মাটির ঘরের বারান্দায়। রাতের অন্ধকারে বৃষ্টির ছন্দে মিশে যাচ্ছিল পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম, কালকের পথটা তো আরও কঠিন হবে!
কিন্তু পরদিন সকালেই প্রকৃতি অন্য রূপ ধারণ করল। রোদ এমন চড়া যে গা পুড়তে শুরু করল। বৃষ্টিতে ভেজা মাটি থেকে একটা সোঁদা গন্ধ আসছে, রোদের তাপ আর সেই বাষ্প মিশে এক অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ। আমাদের সামনে কঠিন পথ—গ্রাম পেরিয়ে পাহাড়ে, তার পর আরও পাহাড়ে।

সাত ঘণ্টার হাঁটাপথ: কিলোমিটারের গল্প —–
আমরা সমতলের হিসাব নিকাশ ছেড়ে পাহাড়ি সময়কে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লাম। ঘড়ির কাঁটায় দেখলাম পুরো সাত ঘণ্টা সময় লেগেছে। পাহাড়ি পথে এই সাত ঘণ্টা মানে আপনি প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন। হ্যাঁ, শুধু পাহাড়ি টিলা বেয়ে চলা, মাঝে মাঝে ঝরনার স্বচ্ছ পানি দিয়ে তৃষ্ণা মেটানো আর ঘন বনের মধ্য দিয়ে যাওয়া।
জমিনের পথ থেকে গ্রাম পেরিয়ে আমাদের প্রথম যাত্রা শুরু হয়। এই গ্রামগুলো অদ্ভুত শান্ত। দূর থেকে পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট মাটির বা বাঁশের ঘর। গ্রাম ছাড়িয়ে শুরু হলো জুম চাষের রাজত্ব।

জুম চাষ: আদিবাসী জীবনের গল্প —–
পাহাড়ে উঠতেই চোখে পড়ল আদিবাসী জুমিয়াদের জুম ক্ষেত। এখানকার আদিবাসী পাহাড়িরা পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে চাষ করে। এটিকে তারা ‘জুম চাষ’ বলে ডাকে। তারা পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে, তারপর পুড়িয়ে ছাই ছাই করে ফেলে। সেই ছাইয়ে বীজ বুনে দেয়। এই ছাই যেমন জমির উর্বরতা বাড়ায়, তেমনি মাটিকে অনেকদিন পর্যন্ত শক্ত রাখে। এই জুম ক্ষেতে তারা ধান, সবজি, আর অন্যান্য অনেক রকমের শস্য ফলায়। তাদের এই কঠোর পরিশ্রমের ফল—পাহাড়ি জনপদের প্রধান খাবার।
শত বছরের বহিরা গাছের মিতালী—–
পথের মাঝে মাঝে আমাদের অবাক করে দিচ্ছিল বড় বড় বহিরা গাছ। শত বছর বয়সী এই গাছগুলো যেন পাহাড়ের প্রহরী। তাদের বিশাল ডালপালা আর শিকড় পাহাড়ি মাটি আঁকড়ে ধরে আছে। আদিবাসীরা এই গাছগুলোকে খুব সম্মান করে। তারা বিশ্বাস করে, এই গাছগুলো তাদের রক্ষা করে। কোনো গাছ কাটার আগে তারা অনুমতি নেয়, পূজো দেয়। এই বন শুধু গাছ নয়, এটা তাদের জীবন, তাদের ঐতিহ্য।

বৈচিত্র্যময় চরিত্রের পবিত্র বন —–
বনটা অদ্ভুত। তার বৈচিত্র্যময় চরিত্র আমাকে বার বার অবাক করছিল। এক মুহূর্ত মনে হচ্ছে, এখানে কোনো দিন কেউ আসেনি, পরের মুহূর্তেই দেখতাম কোনো একটা আদিবাসী নারী কাঠ সংগ্রহ করছে। বনের এক কোণে দেখলাম একটি বন্যপ্রাণী ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, কোনো অচেনা পাখির মিষ্টি সুর—সব মিলে এক অদ্ভুত জাদুকরী পরিবেশ।
রাতের বেলা বনের রূপ আরও রহস্যময়। চাঁদের আলোয় পাহাড়ের চূড়াগুলো রূপালী রং ধারণ করে। বনের মধ্য দিয়ে ঝরনার পানির শব্দ গভীর নিস্তব্ধতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক একটি নতুন অভিজ্ঞতা। প্রকৃতি, মানুষ, আর তাদের এই মিতালী—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত কাব্যিক রূপ ধারণ করেছে। আমি, ছন্দ সেন চাকমা, সেই রূপ ক্যামেরায় বন্দি করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু জানি, এই সৌন্দর্য ক্যামেরায় সবটুকু ধরা দেওয়া কঠিন। পাহাড়ের পবিত্র বুকেই এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষিত হয়ে থাক।

| ১৯ মে ২০২৬


















