ঐতিহ্যের প্রতীক ‘মালথ্রুং’ বিলুপ্তির পথে
মথি ত্রিপুরা, রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ সংরক্ষণের কাঠামো “মালথ্রুং” আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আধুনিকতার প্রভাব, প্লাস্টিকের ড্রাম ও আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়িদের এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
মালথ্রুং মূলত বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি বড় আকৃতির বিশেষ ধরনের পাত্র বা কাঠামো, যেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ করতেন। শতবর্ষ ধরে এই মালথ্রুংয়ে রাখা হতো সুচিশুভ্র ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কাপড়-চোপড়, এমনকি সোনা-রূপা ও বিভিন্ন ধরনের গহনা। পাহাড়ি সমাজে এটি ছিল সম্মান ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা, ম্রো ও খুমি সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে একসময় মালথ্রুং দেখা যেত। সাধারণত ঘরের ভেতরে বা বিশেষ সম্মানিত স্থানে এটি রাখা হতো। বাঁশ ও বেতের সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি এই কাঠামো নির্মাণ করতে প্রায় ৬ থেকে ৭ দিন সময় লাগে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া মিতা বাঁশ ও বেত ব্যবহার করে দক্ষ কারিগররা হাতে তৈরি করতেন এই ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষণ পাত্র।

ভাষাভেদে মালথ্রুংয়ের নামও ভিন্ন। ত্রিপুরা ভাষায় একে বলা হয় “বখোঃ”, মারমা ভাষায় “ওয়াইংডং”, ম্রো ভাষায় “খোঁংতম”, আর চাকমা ভাষায় পরিচিত “মালথ্রুং” নামে।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, অতীতে প্রায় প্রতিটি পাহাড়ি পরিবারেই একটি করে মালথ্রুং ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন এটি তৈরির কৌশল জানে না। পাশাপাশি সহজলভ্য আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতির কারণে ঐতিহ্যবাহী এই কাঠামো এখন খুব কমই চোখে পড়ে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে পাহাড়ি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, মালথ্রুং কেবল একটি সংরক্ষণ পাত্র নয়; এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে গবেষণা, নথিভুক্তকরণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি বলে তারা মনে করেন।




