| ৮ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম:

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি সংগ্রামী জীবন বাস্তব বৈচিত্র্যের রূপ পরিবর্তনের আশা

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি সংগ্রামী জীবন বাস্তব বৈচিত্র্যের রূপ পরিবর্তনের আশা

 

বিশেষ প্রতিবেদক, রাঙামাটি :

পাহাড়ি ঝুম চাষ বা শিফটিং এগ্রিকালচার পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একটি ঐতিহ্যবাহী এবং প্রধান কৃষি পদ্ধতি। এটি কেবল তাদের জীবিকার উপায় নয়, পাহাড়ি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জুম চাষের পুরো প্রক্রিয়াটি ঋতুচক্রের সাথে আবর্তিত হয়। নীচে এর মূল পদক্ষেপ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা হল :

🌾 জাম চাষের প্রধান ধাপ-

পাহাড় নির্বাচন এবং বন কাটা (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি): সাধারণত বছরের শুরুতে জুম চাষের উপযোগী পাহাড় নির্বাচন করা হয়। তারপর পাহাড়ি ঢালের গাছপালা ও ঝোপ কেটে রোদে শুকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়।

পোড়ানো এবং জমি তৈরি (মার্চ-এপ্রিল) : শুকনো গাছপালা এবং লতাগুলিকে আগুন দেওয়া হয়। এই আগুনের ছাই মাটির উর্বরতা বাড়াতে প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। বৃষ্টির আগে জুম জমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়।

বীজ বপন (এপ্রিল – মে) : এটি জাম চাষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। পাহাড়ি মহিলারা তাদের পিঠে ‘তুরুং’ (বাঁশের ঝুড়ি) বেঁধে একটি দা দিয়ে মাটিতে ছোট গর্ত করে এবং ধান, তুলা, মারফা (পাহাড়ি শসা), তিল, ভুট্টা, মরিচ এবং বিভিন্ন শাকসবজির বীজ বপন করে।

পরিচর্যা ও ফসল কাটা (জুলাই-নভেম্বর) : বর্ষাকালে ফসল কাটা হয়। মারফা, ভুট্টা ও সবজি সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে পাকে। আর প্রধান ফসল—পাহাড়ি ধান—সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে পাকা শুরু হয়। ফসল কাটার পর পাহাড়ে শুরু হয় নবান্ন উৎসব।

ঐতিহ্যবাহী ‘জুম ঘর’ (মাচাং ঘর) : জুম চাষের সময় পাহাড়ের চূড়ায় বাঁশ ও খড়ের ওপর তৈরি করা হয় এক ধরনের অস্থায়ী মাচাং ঘর, যার নাম ‘জুম বাড়ি’।

এটি বন্য প্রাণী থেকে ফসল রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়।
গরম বিকেলের রোদ বা বৃষ্টিতে জুমিয়ারা এখানে বিশ্রাম নেয় এবং দুপুরের খাবার খায়।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং পরিবর্তন অতীতের তুলনায় আজ জাম চাষে বেশ কিছু পরিবর্তন ও

চ্যালেঞ্জ রয়েছে : জমির স্বল্পতা এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস: আগে একটি পাহাড়ে জাম চাষের পরে এটি 10-এর জন্য পতিত ছিল।১৫ বছর যাতে প্রকৃতি তার নিজের উর্বরতা ফিরে পায়। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পাহাড় ধসে যাওয়ায় এখন ৩-৪ বছরের মধ্যে একই পাহাড়ে আবার চাষ করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ, মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং ফলন আগের মতো নেই।

পরিবেশগত প্রভাব : ঘন ঘন জুম চাষের ফলে পাহাড়ের চূড়ার উর্বর মাটির ক্ষয় হয়, যা ঝিরি বা রিমের উর্বরতা হ্রাস করে।

জুমেইরা মিশ্র চাষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে: অনেক পাহাড়ি কৃষক এখন ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ থেকে স্থায়ী ফলের বাগানে (যেমন আম, লিচু, আনারস, কাজু, কফি) এবং আদা-হলুদ-এ চলে যাচ্ছে।

একটি সুন্দর ঐতিহ্য : জুম চাষ মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাইং’ বা ত্রিপুরা ও চাকমাদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসবের গান এবং সংস্কৃতির সাথে জড়িত। পাহাড়ের গায়ে সোনালী ঝুমঝুম যখন বাতাসে দোল খায়, তখন পাহাড়ের রূপ সত্যিই দেখার মতো।

টানা বর্ষণে কাপ্তাইয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তি, পাহাড় ধসে চার ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি সংগ্রামী জীবন বাস্তব বৈচিত্র্যের রূপ পরিবর্তনের আশা

 

​রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :

​টানা তিন দিনের ভারীবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর বাড়ায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই বর্ষণ জনজীবনে দুর্ভোগও ডেকে এনেছে ; পাহাড় ধসের কারণে আজ সকালে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে ৪টি ইউনিট সচল রেখে ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ​

সহকারী প্রকৌশলী মো. তারেক আহমেদ জানান, উৎপাদিত ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের মধ্যে ১নং ইউনিটে ৩৫ মেগাওয়াট, ২নং ইউনিটে ৩৪ মেগাওয়াট, ৪নং ইউনিটে ২৮ মেগাওয়াট এবং ৫নং ইউনিটে ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে হ্রদে পানির স্তর রয়েছে ৭৯ দশমিক ৯ ফুট এমএসএল (মিনসি লেভেল)। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, ২৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্রে পানির স্তর ১০৯ ফুট এমএসএল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে স্বস্তি ফিরলেও টানা বর্ষণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আজ সকালে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধসে পড়ে। এতে ভোর থেকে প্রায় চার ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় মাটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের বিশেষ সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

টানা বর্ষণে ফেনী নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে, পাহাড় ধসের শঙ্কা, আতঙ্কে নদীকুলের মানুষ

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি সংগ্রামী জীবন বাস্তব বৈচিত্র্যের রূপ পরিবর্তনের আশা

 

সাইফুল ইসলাম, রামগড় (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি :

টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। ফেনী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অপরদিকে উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অব্যাহত বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন খাল, ছড়া ও নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীকূলের মানুষ প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, রাতভর বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ফেনী নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে বসতবাড়িতে প্রবেশ করতে পারে। এদিকে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মাটি ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের ওপর পাহাড়ের মাটি নেমে আসায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, কয়েক দিন ধরে একটানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে রামগড় উপজেলা প্রশাসন জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ধস প্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং প্রয়োজন হলে নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনে নদী ও পাহাড় সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রামগড়ে ১৫টির অধিক আশ্রয়ন কেন্দ্র রয়েছে। এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া বাজার ডাক বাংলা পাড়া প্লাবিত

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি সংগ্রামী জীবন বাস্তব বৈচিত্র্যের রূপ পরিবর্তনের আশা

 

চাইথোয়াইমং মারমা, বিশেষ প্রতিবেদক:

বিরতিহীন ভারি বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি বাঙ্গালহালিয়া খালের হয়ে উজানে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া বাজার ও ডাকবাংলা পাড়া নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া  ইউনিয়নের অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় বসবাসকারী অন্তত প্রায় ১৫০ পরিবারের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে বেশ কিছু সড়ক। বিরতিহীন বৃষ্টির কারণে রাজস্থলী উপজেলার ১টি ইউনিয়ন গ্রামের লোকালয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় পতিত হচ্ছে।

পার্বত্য অববাহিকার বাঙ্গালহালিয়া নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ের ঢলের পানি বৃদ্ধি পেলেও আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত অতিবিপদসীমা অতিক্রম করেনি। বাজার দিন হওয়াতে সাধারণ ক্রেতা বিক্রিতারা চরম অসুবিধায় পড়েছে। তবে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ভয়াবহ বন্যার শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এ এলাকার মানুষ। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড়বেষ্টিত গ্রামীণ এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে পাহাড়ে বসবাসকারীদের।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতন করার পরও পাহাড়ে বসবাসকারীরা নিরাপদ স্থানে সরে না যাওয়ায় গতকাল থেকে যারযার বাড়ীতে অবস্থান করছে। বাজার পাশে পানি পানি নিষ্কাশন না থাকায় বৃষ্টির পানির ঢল জলাবদ্ধা পানি বেড়ে যায়।

বাঙ্গালহালিয়া  ইউনিয়নের ৪,৫,৬ নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্যা বাপ্পি দে দাবি করেছেন, অতি ভারি বর্ষণের কারণে ইউনিয়নের বাজার ও ডাকবাংলা পাড়া  নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় এবং উজানে ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় যেকোনো সময় ভয়াবহ বন্যার দেখা দিবে বলে স্থানীয় জানান।

৩নং বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আদোমং মারমা বলেন, ‘ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। উজানের পানি যাতে দ্রুত ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে সেজন্য আমার ইউনিয়নের পানি নিষ্কাশনের স্লুইস গেটগুলির কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানা যায় ।

×