শিরোনাম:

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা,

বিলাইছড়ি (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়নে প্রায় ৭০টি গ্রাম এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। নেই তেমন সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থাও। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস এবং পাহাড় পর্বতে ঘেরা এই এলাকাটি। মোট ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে  জনসংখ্যায় বেশি ফারুয়া ইউনিয়ন। ফারুয়া ইউনিয়নে আয়তন ২৮০ বর্গকিলোমিটার এবং বড়থলি ইউনিয়নের আয়তন ২৭৮ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা অনুসারে এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারী বেশি।

ডিজিটাল যুগে এসেও এখনো মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে রাঙামাটি বিলাইছড়ির ফারুয়া ও বড়থলি  ইউনিয়ন। ফারুয়া ৫০টি এবং বড়থলি ২০টি গ্রাম। দুই ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজারেও বেশি জনগণের বসবাস। মোবাইল ফোনে নেটওর্য়াক না থাকার ফলে ডিজিটাল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। শুধু ফারুয়া ইউনিয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২১টি। তন্মধ্যে বড়থলিতে ৪ টি। সেখানে মোবাইল নেটওর্য়াক না থাকার কারণে তারা  যুগের সাথে তাল মেলাতে পারছেন না। বর্তমানে সব কিছু ডিজিটাল আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, নাগরিক সেবা অনলাইনের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। যাতে প্রত্যেক নাগরিক খুব সহজে ঘরে বসে সেবা পায়। কিন্তু এই দুই ইউনিয়নের জনগণ এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

সরেজমিনে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এই ফারুয়া ইউনিয়ন। প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করছেন। একইভাবে ফারুয়ার দক্ষিণে মায়ানমার ও ভারতের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ৪০০০ জনসংখ্যা রয়েছে বড়তলি ইউনিয়নেও। এখানে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র কৃষির উপর নির্ভরশীল। তবে দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষদের দেখলে মনে হওয়ার কোনো অবকাশ নেই যে এরা বাংলাদেশের জনগণ। এটাতো দুর্গম আর পশ্চাৎপদ এলাকা, অন্য দিকে মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। ফলে দেখা যায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কৃষক তার ফসলি জমির যেকোনো সমস্যায় কৃষি বিশেষজ্ঞ কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ পান না। সেক্ষেত্রে তাকে উপজেলা সদরে আসতে হয়।

দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, মোবাইল ফোন, ইন্টারেনট সেবা এখন পৌ্ছেঁ গেছে ঘরে ঘরে। অথচ কাল্পনিক মনে হলেও বাস্তব সত্য যে ফারুয়া ও বড়থলি এই দুই ইউনিয়নে মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতির সময় সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে। এখানকার শিশুরা এই সেবা (নেটওয়ার্ক) থেকে বঞ্চিত। স্থানীয় অভিভাবকদের দাবী, তাদের সন্তানরা যেন জরুরি নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ এই সুবিধাটি পায়। এছাড়া প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নেই মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা। সারা বাংলাদেশের মানুষ যেখানে ঘরে বসে ডিজিটাল সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে এসব এলাকার ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ জনসাধারণ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

কৃষক / জুমিয়ারা জানান, জুম ও জমিতে উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসব্জি এবং মসলা জাতীয় পণ্য আদা, হলুদ দেশে চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক ও মূল সড়কের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধা না হওয়ায় ঠিকমত ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংরক্ষণ এবং বাজারজাত করা যাচ্ছে না। যার ফলে নার্য্যমূল্য পাচ্ছি না, কোনো কোনো সময় পঁচন ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, সরকার চাইলে যে কোনো মুহূর্তে করতে পারে, এজন্য দরকার সকল প্রশাসনের সদিচ্ছা। অনেক কষ্টের মধ্যে আছি আমরা। এখানে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইলে নেটওয়ার্ক নাই। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি পাওয়া এগুলো সব মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেগুলো আমাদের শিক্ষার্থীরা ঠিক মতো পাইও না, জানেও না। অসুস্থ রোগীদের জন্য ঠিক মতো চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা নাই। অভিজ্ঞ ডাক্তারদের যে পরামর্শ নেব সেই সুযোগও নাই। বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকায় আমরা সরকারের নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তারা জানান, মনে হয় আমরা এদেশের জনগণ নই। সেজন্য সরকার আমাদের দেখতে পারেনা। সরকার চাইলে এটা সমাধান করতে পারেন। এ বিষয়ে নেই কোনো সরকার ও কোনো প্রশাসনের সদিচ্ছা। এজন্য প্রয়োজন উপজেলা ও জেলার সকল প্রশাসন ও পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক জানান, নেটওয়ার্কের যতো ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা আছে তা আমরা পাচ্ছি না। বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কাজগুলো আমাদের বিলাইছড়ি অথবা পার্শ্ববর্তী উপজেলা রাজস্থলী এবং বান্দরবানে রুমা উপজেলায় গিয়ে করতে হয়। যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। আমাদের নেটওয়ার্কের অসুবিধার কারণে এইসব এলাকায় যেতে হচ্ছে।

এলাকার হেডম্যানরা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের মতো উন্নত দেশে পরিণত। দেশে প্রায় জায়গায় সড়ক, নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সুবিধা উন্নতি করা হচ্ছে, করা হচ্ছে না আমাদের ইউনিয়নগুলো। স্বাধীনতার আগ থেকেই এই গ্রামগুলোতে বসবাস করে আসছে মানুষ। সরকার দেখেও না দেখার মতো বেখেয়ালিতে সময়ক্ষেপণ করছে।

ধর্মীয় গুরু/পালক প্রধান রবার্ট বম জানান, উপজেলা ও শহরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় রঙিন আলোতে ঝলমল করে। সেখানে গেলে রঙিন জগতে বসবাস করছি বলে মনে হয়, কিন্তু নিজের জায়গায় আসলে মনে হয় ভিন্ন জগতে বসবাস করছি। আর ফারুয়ার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ঢুকলে টর্চের আলো দিয়ে ঢুকতে হয়। নেটওয়ার্ক তো নাই, নাই বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের কথা না হয় বাদ দিলাম।

ওয়ার্ড মেম্বাররা জানান, মোবাইল নেটওর্য়াক না থাকায় এলাকায় বড় সমস্যা। বন্যা ও মহামারী হলে অনেক সময় সরকারের মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওয়ার্ড গুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু এলাকা মোটর বাইকে যেতে পারলেও বেশির ভাগ এলাকায় যেতে হয় পায়ে হেঁটে। যেকোন মুহূর্তে বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশংকা সবসময় সকলের মধ্যে থাকে। তবুও জনগণের জন্য কাজ করে যেতে হচ্ছে।

বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া থেকে যোগাযোগের পথ বর্তমানে পাশ্বর্বতী উপজেলা রাজস্থলীর সাথে কিছুটা  সুব্যবস্থা হলেও, উন্নতি করা হয়নি ফারুয়ার সাথে উপজেলা সদর পর্যন্ত। স্বাধীনতার পর থেকে সড়ক পথ করা হয়নি ফারুয়া হতে বড়থলি পর্যন্ত রাস্তাও। এখানকার যাতায়াতে ফারুয়া ইউনিয়নের সঙ্গে কিছুটা সড়ক পথ থাকলেও নেই কোনো বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্কের সুবিধা। যার ফলে চরম বিপাকে ফারুয়া ও বড়থলিবাসী।

ফারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ১৯৮৪ সালে ইউনিয়নটি উন্নীত করা হলেও এখনো নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সংযোগ করা হয়নি। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শতভাগ করার জন্য সরকার থেকে নির্দেশনা আসে কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে আমার এই জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনটি সঠিকভাবে করতে পারছিনা। প্রতিবন্ধীভাতা, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচী মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পেমেন্ট করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে এদের ভাতা ঠিক মতো পায় না।

তিনি আরও বলেন, এ ইউনিয়নটি অতি দুর্গম হওয়াতে অন্যান্য ইউনিয়ন থেকে উন্নয়নে পিছিয়ে আছে, মোবাইল ফোনে নেটওর্য়াক না থাকার কারণে সহজে যোগাযোগ করা যায় না। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে ফারুয়া ইউনিয়নের সেবাদানের লক্ষ্যে সরকার যাতে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের টাওয়ার স্থাপন এবং বিদ্যুৎ সুবিধা  সহ সেজন্য ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে জোর দাবী জানিয়েছেন।

বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা জানান, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুর্গম ইউনিয়ন হচ্ছে বড়থলি ইউনিয়ন। ২০১৩ সালে ৪ নভেম্বর ফারুয়ার ৮ ও  ৯নং ওয়ার্ডকে আলাদা করে বড়থলি ইউনিয়নে উন্নিত করা হয়। ইউনিয়নটি উন্নিত হলেও এখনও ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মোবাইলে নেটওয়ার্ক তো দুরের কথা। ইউনিয়নটি বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার কাছাকাছি হওয়ায় বড়থলি সীমান্তে রুমা উপজেলার কাছাকাছি এলাকায় একটি অস্থায়ী কার্যালয়ে অফিস পরিচালনা করছি। হাইস্কুল ১টি রয়েছে, রয়েছে ৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। মোবাইলে নেটওয়ার্ক কথা বাদ দিলাম, উপজেলায় অফিসিয়াল কাজে আসতে হলে আসতে হয় রুমা, বান্দরবান, রাজস্থলী ও কাপ্তাই উপজেলা হয়ে। যা প্রায় ২ দিন সময় লাগে। আর বড়থলি থেকে ফারুয়ার পথে কোনো সড়ক পথ নেই। হেঁটে আসলে প্রায় ১ সপ্তাহ সময় লাগে। বিদ্যুতের কথা বাদ দিলাম। তাই বিদ্যালয় গুলো নেটওয়ার্কের আওতায় এনে দ্রুত জাতীয়করণ করা প্রয়োজন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সুরজিত দত্ত জানান, ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়নে বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক না থাকায় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো ঔষধ সরবরাহ করা খুবই কঠিন হচ্ছে । গর্ভবতী মা এবং শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। রেজিষ্ট্রেশন, টিকা ও মেডিকেল / চিকিৎসা ক্যাম্প সঠিকভাবে পরিচালনায় ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষাকালে বন্যার পরে বিশুদ্ধ পানি না থাকার কারণে ডায়রিয়া, গ্রীষ্মকালে কলেরা সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। এতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে। ইউনিয়ন গুলো দুর্গম হওয়ায় কোনো কোনো সময় ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছার আগেই রোগী মারা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেছেন, দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওর্য়াক পৌছে দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের ই-লার্নিং ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১০০টি বিদ্যালয়ে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে অর্ন্তবর্তী সরকার। এ উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত এক বিপ্লব হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা অনলাইনে শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাসে অংশ নিতে পারবে। ডিজিটাল যুগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে এ এলাকার জনগণ তাই জনজীবনে অতিব গুরুত্বপূর্ণ এই ডিজিটাল সেবা মোবাইল ফোন নেটওর্য়াক, বিদ্যুৎ ও সংযোগ সড়ক পথ চালুর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় এলাকাবাসী।

আলীকদম জোনের উদ্যোগে পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ায় প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

‎ ‎সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ, ‎আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি :

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়নের আওতাধীন আলীকদম জোনের উদ্যোগে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে মায়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ায় ‘সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারী) সকালে বিদ্যালয়টির উদ্বোধন করেন আলীকদম জোন কমান্ডার লেঃ কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক, এসপিপি, পিএসসি। ‎‎বিদ্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

এ সময় স্থানীয় ৩১৫ জন অসহায় রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ১১৩টি দরিদ্র পরিবারের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। ‎আলীকদম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং মায়ানমার সীমান্ত থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত পাহাড়ভাঙ্গা পাড়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে ফাতরাপাড়া, মাসখুম পাড়া ও তরণী পাড়ার শিশুদের জন্য নিয়মিত শিক্ষাগ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে আলীকদম জোন এ অঞ্চলে ‘সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। উদ্বোধন শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ব্যাগ, বেঞ্চ, পাঠ্যবই ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। ‎এছাড়া সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ মেডিকেল টিম দুই দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করে। এতে ৯৫ জন পুরুষ, ১৭৫ জন নারী ও ৪৫ জন শিশুসহ মোট ৩১৫ জনকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়।

‎অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে লেঃ কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। দুর্গম এই জনপদে শিক্ষার যাত্রা স্থানীয় শিশুদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ‎ ‎অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম, মেজর মোঃ পাভেল মাহমুদ রাসেল, বিএসপি, আলীকদম জোনের জোনাল স্টাফ অফিসার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আলী তাওহীদ এবং লামা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ মাসুম সরদার। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কার্বারি ও বিপুলসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ‎

‎সেনাবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এই ধরনের কার্যক্রম দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

৯ম পে-স্কেলের দাবিতে লংগদুতে কর্মচারীদের বিক্ষোভ

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, লংগদু :

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির লংগদুতে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল ঘোষণাসহ এক দফা দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট, কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন সরকারি কর্মচারীরা। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারীদের দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সম্মিলিত পরিষদের কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় এই কর্মসূচি পালিত হয়। ​

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীরা একত্রিত হয়ে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ব্যানার হাতে নিয়ে তারা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

আন্দোলনরত কর্মচারীরা বলেন, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশকৃত বৈষম্যহীন এক দফা এক দাবি অর্থাৎ ৯ম পে-স্কেলের গেজেট জারি করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে বর্তমান বেতন কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ফলে নিম্ন ও মধ্যমসারির কর্মচারীরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই কর্মসূচিটি গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এই অবস্থান ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালিত হচ্ছে। ​

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন, আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে আমাদের বর্তমান বেতন দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সরকার যদি অবিলম্বে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ না করে, তবে আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ​লংগদু উপজেলার সরকারি কর্মচারী পরিষদের নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে দ্রুত প্রদান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। কর্মসূচি চলাকালীন দাপ্তরিক কাজে কিছুটা স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেলেও কর্মচারীরা তাদের অধিকার আদায়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।

কাপ্তাইয়ে বিদ্যুৎ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মচারীদের রাজপথে অবস্থান ; দ্রুত ৯ম পে-স্কেল ঘোষণার দাবি

রাঙামাটির ফারুয়া ও বড়থলি ইউনিয়ন এখনো বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌছায়নি ; প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা

 

রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :

​জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশকৃত বৈষম্যহীন এক দফা দাবি—৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবিতে রাঙ্গামাটি কাপ্তাইয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে কাপ্তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারীদের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ ঘোষিত দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এদিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাপ্তাই সড়কের কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মূল ফটকের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সংগতি রেখে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তারা অবিলম্বে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বৈষম্যহীন পে-স্কেল ঘোষণার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন (সিবিএ) কাপ্তাই শাখার সভাপতি মোঃ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সহ-সভাপতি কবিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোঃ বেলায়েত হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোর্শেদ আলম, যুব বিষয়ক সম্পাদক  শহিদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় যুব কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ দিদার হোসেন, মোঃ মোশাররফ হোসেন, মোঃ তোফাজ্জল হোসেন প্রমুখ।

​উক্ত মানববন্ধনে কাপ্তাই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের শতাধিক কর্মচারী উপস্থিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেন। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট জারি না হলে তারা কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সাথে একাত্ম হয়ে আরও কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

×