মেঘ-আকাশ ছুঁয়ে রোমাঞ্চের ঠিকানা : ঝিকঝাক পাহাড়ে বাড়ছে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
উচ্চপ্রু মারমা, রাজস্থলী (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :
রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি উপজেলার মাঝামাঝি অবস্থিত ঝিকঝাক পাহাড় ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। পাহাড়ের বুক চিরে যাওয়া আঁকাবাঁকা উঁচু সড়ক, আকাশছোঁয়া উচ্চতা, মেঘের আনাগোনা আর নিসর্গের অপার সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে ঝিকঝাক পাহাড় এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে শীত মৌসুমে এই পাহাড়ি এলাকার সৌন্দর্য নতুন রূপে ধরা দেয়। নীল আকাশের নিচে সারি সারি পাহাড়, গভীর খাদ, সবুজ বনভূমি আর ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ যেন পর্যটকদের চোখে এক স্বপ্নিল দৃশ্য এঁকে দেয়। পাহাড়, মেঘ ও মানুষের দুঃসাহসিক অভিযাত্রার মিলনে ঝিকঝাক পাহাড় হয়ে উঠছে এক অনন্য পর্যটন অভিজ্ঞতার নাম।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৪শ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ঝিকঝাক পাহাড় এলাকায় নির্মিত হয়েছে উঁচু ও সর্পিল সড়কপথ। পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা এই সড়ক কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং এটি নিজেই একটি পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়, গভীর খাদ আর বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে, যা ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ভোর কিংবা বিকেলের আলোয় পাহাড়ের চূড়ায় ভেসে বেড়ায় হালকা কুয়াশা। অনেক সময় চারপাশ ঢেকে যায় ঘন সাদা মেঘে। কখনও কখনও সেই মেঘ রাস্তার উপর দিয়ে বয়ে যায়—মনে হয়, গাড়ি বা বাইক যেন মেঘের বুক চিরে এগিয়ে চলছে। এমন দৃশ্য পর্যটকদের কাছে রূপকথার মতো অনুভূতি তৈরি করে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা এক পর্যটক বলেন, ঝিকঝাক পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালেই মনে হয়, সব দুঃচিন্তা হারিয়ে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে আকাশটা যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়।”

পর্যটকদের মতে, পাহাড়ের এই নিস্তব্ধতা, বিশালতা আর প্রকৃতির সান্নিধ্য মানুষের মনে এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়, যা ব্যস্ত নগর জীবনে পাওয়া কঠিন।
ঝিকঝাক পাহাড়ের সড়কটি বিশেষভাবে বাইকপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুঃসাহসপ্রিয় বাইকাররা এখানে ছুটে আসছেন রোমাঞ্চকর রাইডের অভিজ্ঞতা নিতে। খাড়া ঢাল, সরু রাস্তা, তীব্র বাঁক এবং এক পাশে গভীর পাহাড়ি খাদ—সব মিলিয়ে এই সড়কটি দেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং ও রোমাঞ্চকর বাইকিং রুট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তবে রোমাঞ্চের পাশাপাশি ঝুঁকিও কম নয়। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে পড়ে এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় দৃশ্যমানতা কমে যায়। শীতকালে ভোরবেলায় ঘন কুয়াশা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। চলতি বছরে অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ি খাদে পড়ে কয়েকজন সাধারণ যাত্রী ও শ্রমিক আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এ বিষয়ে মিতিংগ্যা ছড়ি পাড়ার কার্বারী (গ্রাম্য প্রধান) পূন্যচন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ঝিকঝাক পাহাড় আগে জোড়া লাগানো পাহাড় ছিল। সেনাবাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এখানে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এই পথে চলাচলে ধীর গতি বজায় রাখা, হেলমেট ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। অভিজ্ঞ চালক ছাড়া এই পথে যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ।”
স্থানীয়রা মনে করেন, পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
রাজস্থলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার জানান, আমি ও জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী কয়েকদিন আগে বিলাইছড়ির ফারুয়া যাওয়ার পথে ঝিকঝাক পাহাড় এলাকা পরিদর্শন করেছি। এটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও সম্ভাবনাময় এলাকা হলেও উঁচু-নিচু সড়কের কারণে ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বর্তমানে অন্যান্য পর্যটন স্পটে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দেশের অন্যতম উঁচু সড়কপথ, মেঘে ঢাকা পাহাড় আর দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে ঝিকঝাক পাহাড় এখন রাজস্থলী, বিলাইছড়ি ও জুরাছড়ি উপজেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ঝিকঝাক পাহাড় অদূর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম অনন্য ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।














