শিরোনাম:

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

ছবি- প্রতিকী

 

ছন্দ সেন চাকমা, চীফ ফটোগ্রাফার ও কলামিস্ট :

​আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি বিশেষ দিন। কিন্তু বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে যে মেঘলা পাহাড়ের সারি, সেখানে নারী দিবস মানে কেবল একটি তারিখ নয়; সেখানে নারী দিবস মানে এক অবিরাম অস্তিত্বের লড়াই। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যে রক্তিম সূর্য ওঠে, সেই সূর্যের প্রথম আলো পড়ে একদল লড়াকু নারীর ঘর্মাক্ত কপালে। তারা আমাদের আদিবাসী জুমিয়া নারী—যাঁরা একদিকে ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে আধুনিক বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। ​

জুমের অর্থনীতি ও জীবনসংগ্রাম ​পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে ‘জুমিয়া’ শব্দটি কেবল একটি পরিচয় নয়, এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের মহাকাব্য। কাক ডাকা ভোরে যখন কুয়াশার চাদর পাহাড়কে ঢেকে রাখে, তখন থেকেই শুরু হয় জুমিয়া নারীদের জীবনযুদ্ধ। পিঠে থুরুং (ঝুড়ি) বেঁধে দুর্গম পাহাড়ের ঢালে তাঁদের যে পদযাত্রা, তা মূলত সচল রাখে পাহাড়ের আদিম ও অকৃত্রিম জুম অর্থনীতিকে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা—সবখানেই নারী। ​কেবল কৃষি কাজই নয়, কোমর তাঁতে নিজের পিনন-হাদি বোনা থেকে শুরু করে সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি তাঁরা সামলান নিপুণ হাতে। তাঁরাই পাহাড়ের বস্তুতন্ত্রের অঘোষিত রক্ষক। কোন লতা ঔষধি, কোন বৃক্ষ পাহাড়কে ধস থেকে রক্ষা করে—এই আদিম জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জুমিয়া নারীরাই বহন করে চলেছেন। অথচ এই কঠোর শ্রমের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে তাঁদের স্বীকৃতির জায়গাটি আজও অনেকখানি ধূসর। ​

খেলার মাঠে পাহাড়ের জয়গান: এক নতুন বিপ্লব ​তবে গত কয়েক বছরে পাহাড়ের এই দৃশ্যপটে যুক্ত হয়েছে এক অভাবনীয় সোনালী অধ্যায়। পাহাড়ের ঢালে যে পা-গুলো একদিন পাথুরে পথ পাড়ি দিত, সেই পা-গুলোই আজ ফুটবল আর ক্রিকেটের সবুজ গালিচায় প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করছে। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বর্তমান যে জোয়ার, তার মূল কারিগর আমাদের পাহাড়ের কন্যারা। ​ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, কৃষ্ণা রানী সরকার, মারিয়া মান্দা বা মনিকা চাকমাদের নাম আজ প্রতিটি বাঙালির ড্রয়িংরুমে পরিচিত। সাফের (SAFF) শিরোপা জয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো—সবখানেই এই আদিবাসী নারীদের অদম্য জেদ কাজ করেছে।

দুর্গম পাহাড়ের জরাজীর্ণ মেঠোপথ থেকে উঠে এসে তাঁরা আজ দেশের ‘পোস্টার গার্ল’। তাঁদের এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করে যে, আদিবাসী নারীরা কেবল শ্রমের কারিগর নন, তাঁরা মেধা আর সাহসেরও আকর। তারা শিখিয়েছেন কীভাবে সীমাবদ্ধতাকে পায়ের জাদুতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হয়। ​অদম্যদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ​আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই শুভক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সব বাবা-মায়েদের প্রতি, যাঁরা দারিদ্র্য আর সামাজিক বাধার দেয়াল টপকে তাঁদের মেয়েদের মাঠে পাঠিয়েছেন। আমরা অভিনন্দন জানাই আমাদের সেই সব আদিবাসী ক্রীড়াবিদদের, যাঁরা নিজেদের রক্ত আর ঘাম দিয়ে প্রমাণ করেছেন—পাহাড় কেবল শান্ত নয়, পাহাড় জানে কীভাবে গর্জে উঠতে হয়। ​পাহাড়ের সেই সব নক্ষত্রদের প্রতি আমাদের স্যালুট! আপনাদের প্রতিটি গোল, প্রতিটি জয় আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আপনারা কেবল গোলবার কাঁপাননি, বরং আমাদের সমাজের সংকীর্ণ মানসিকতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছেন। ​

উপসংহার: স্বীকৃতির দায়বদ্ধতা ​পরিশেষে বলতে চাই, পাহাড়ের নারীদের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন। জুম চাষের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ক্রীড়া ও শিক্ষায় তাঁদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা আজ সময়ের দাবি। জুমিয়া নারীরা দয়া চান না, তাঁরা চান সমমর্যাদা আর শ্রমের উপযুক্ত সম্মান। ​আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—পাহাড়ের সেই সাহসী হাতগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। জুমের ফসল থেকে শুরু করে খেলার মাঠের ট্রফি—সবখানেই যেন আমাদের আদিবাসী বোনদের জয়জয়কার থাকে। পাহাড়ের এই অদম্য কন্যারা ভালো থাকলেই ভালো থাকবে আমাদের বাংলাদেশ। ​পাহাড়ের প্রতিটি লড়াকু নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

আলীকদমে পিআইও বিরুদ্ধে কমিশন বানিজ্যের অভিযোগ।

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বান্দরবানের আলীকদমে প্রকল্পের কাজের কমিশন নেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আলীকদম প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কেএম নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তাছাড়া দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ওই নিজেই ঠিকাদারী করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আছে, আলীকদম নয়াপাড়া ইউনিয়নের দুটি প্রকল্পের ইউপি মহিলা সদস্যকে সভাপতি দেখিয়ে নিজেই প্রকল্পের কাজ করে সেসব কাজের বিলও উত্তোলন করে ফেলেছেন এই দূর্নীতিবাজ পিআইও। কমিশনের বানিজ্য, প্রকল্পের বিল আটকে রাখাসহ ছিল পাহাড় সমান অভিযোগ। এখানে শেষ নয় এর আগেও সুনামগঞ্জে দিরায় উপজেলাতে একই পদে থাকাকালীন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি অভিযোগে ত্রাণ অধিদপ্তরের বদলী করা হয়। সেখানেও তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের অভিযোগের পর শাস্তিমূলক হিসেবে  বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় বদলী করে দেন ত্রাণ অধিদপ্তর। এখানে এসেও সেই দুর্নীতির কার্যক্রম চলমান রেখেছেন  তিনি।

জানা গেছে, প্রতিটি প্রকল্পের জনপ্রতিনিধিদের থেকে অফিসের নানা খরচ দেখিয়ে ১৫ শতাংশ কমিশন নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কমিশন না দিলে কাজের বিল আটকিয়ে নানা হয়রানি করা হয়। কমিশন ছাড়াও চলতি অর্থ বছরে গ্রামীন কাঠামো টিআর প্রকল্পে নিজের ইচ্ছে মতো কাউকে সভাপতি বানিয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করে ফেলেছেন নিজেই। আর সেই প্রকল্পের ভুক্তভোগী ৭.৮.৯ ওয়ার্ডের ইউপি নারী সদস্য। পড়ালেখা ও শিক্ষিত না হওয়াতেই নারী সদস্যটিকে প্রকল্পের সভাপতি বানিয়ে এমন লুটপাটের কাজ চালাচ্ছে পি আইও।

জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, কাবিখা, কাবিটা, টিআরসহ বিভিন্ন প্রকল্পে প্রতিটি কাজের কমিশন হিসেবে ১৫ শতাংশ গ্রহন করে থাকেন। এর আগেও প্রায় ২৫ শতাংশ হিসেবে কমিশন নিতেন পিআইও। শুধু তাই বিভিন্ন প্রকল্পে জনপ্রতিনিধিরা নিয়ম মেনে আবেদন জমা দিলেও প্রকল্পের কাজে নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘কমিশন’ দিলে ফাইলের গতি বদলে যায় আশ্চর্যজনকভাবে। এভাবে প্রতিটি কাজের প্রকল্পের ১৫ শতাংশ কমিশন নেয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পের অন্যকে সভাপতি দেখিয়ে নিজেই কাজের বাস্তবায়ন করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আলীকদমে নয়াপাড়া ইউনিয়নে ৯নং ওয়ার্ডের ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে গ্রামীন কাঠামো টিআর ১ম পর্যায়ে প্রকল্পের মেরিনচর পাড়া সোনে স্কুলের রাস্তা মেরামত। সেখানে প্রকল্পের ওই ইউপি নারী সদস্যকে সারথী রানী ত্রিপুরাকে সভাপতি দেয়া থাকলেও মুল প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে পিআইও নিজেই বাস্তবায়ন করছেন। আর সেখানে মুঠোফোন নাম্বার দেয়া থাকলেও মহিলা সদস্য নাম্বার না দিয়ে ভুল নাম্বার সংযুক্ত দেয়া হয়েছে। একই চিত্র বুজিরমুখ পাড়া যাওয়ার রাস্তায় যাত্রী ছাউনি নির্মাণেও। দুটি প্রকল্পের একই মহিলা ইউপি সদস্যকে ব্যবহার করে এই দুটি প্রকল্পের নিজেই ঠিকাদার হয়ে বাস্তবায়ন করেছেন পিআইও। এই দুটি বরাদ্ধ ছিল পাঁচ লাখ টাকা। সেই দুটি প্রকল্পের কাজের বরাদ্ধ ইউপি নারী সদস্য মাধ্যমে বিল তুলে ফেলেছেন পি আইও।

কুরুকপাতা ও নয়াপাড়া দুই ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাংপু ম্রো ও কফিল উদ্দিন বলেন, প্রতিটি কাজে প্রায় ১৫ পার্সেন্ট কমিশন নিয়ে থাকে। কমিশন না দিলে কোন কাজ কিংবা বিল দিচ্ছে না। এর আগেও ২৫ পার্সেন্ট কমিশন নিতেন। এখন কমিয়ে দিয়ে ১৫ শতাংশ কমিশন নেন। তবে সেসব কমিশন বিষয়ে ইউএনও জানেন না  বলে জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছে।

বান্দরবানে ঠিকাদার শামীম হোসেন জানান, উপজেলায় পিআইও থেকে একটি প্যাকেজে দুটি ব্রীজ বরাদ্দ পেয়েছিলাম। দুটি কাজে বরাদ্দই ছিল প্রায় ১কোটি ৭০লাখ। একটি ব্রিজের নানা খরচ দেখিয়ে দশ লাখ করে দুটি ব্রিজে বিশ লাখ টাকা পিআইও আদায় করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা একজন পিআইও বলেন, এসব নিউজের তিনি তোয়াক্কা করে না। এর আগে বহুবার তার নামে অনিয়ম,দুর্নীতি অভিযোগ ছিল। শাস্তিস্বরূপ হিসেবে এখানে বদলী হয়ে এসেছে। যতই লিখুক তার কিছু করতে পারবে না বলে ঘাড় টেরা করে থাকেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এবিষয়ে প্রকল্পের সভাপতি ইউপি মহিলা সদস্য সারথী রানী ত্রিপুরা সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, মেরিনচর পাড়া সনের স্কুলের সামনে যে রাস্তা সেঈ প্রকল্পের সভাপতি আমাকে বানিয়ে পিআইও নিজেই কাজ করেছে। কাজ শেষে করে সব টাকা ওনাকে দিয়ে ফেলেছি। আমার প্রকল্পের কাজেও ১৩ শতাংশ নাম করে ৪৯ হাজার টাকা কেটে ফেলেছে পি আইও। আমি অশিক্ষিত,বুঝিনা ও জানিও না।

অভিযোগের বিষয়ে আলীকদম প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পিআইও কেএম নজরুল ইসলাম  বলেন, আপনারা যাই পারেন লিখেন তাতেই আমার যা কিছু আসে না। আমার নামে কত লিখেছে’ সে লেখার কারণে আজ বান্দরবানে আসছি।

এবিষয়ে আলীকদম নির্বাহী অফিসার মঞ্জুর আলম জানান, পিআইও কমিশন বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই আর জানিও না। জনপ্রতিনিধিরা এবিষয়ে আমাকে কোন অভিযোগ করেনি। ঠিকাদার ও কমিশন বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

বাঘাইছড়িতে ইউটিউবের ভিডিও দেখে ফুল চাষে সাফল্য জুশি চাকমা

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

 

রুপম চাকমা, দিঘীনালা :

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মগবান গ্রামের জুশি চাকমা সেই পরিশ্রমের সাথে আধুনিকতা ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে পাহাড়ের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষে পাহাড়ি অঞ্চল পিছিয়ে থাকলেও জুশি চাকমা প্রমাণ করেছেন, সঠিক লক্ষ্য আর আধুনিক চিন্তা থাকলে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা সম্ভব।

জুশি চাকমার এই উদ্যোগ কেবল শখের বশবর্তী নয়, বরং তা ছিল প্রখর বাস্তববোধের বহিঃপ্রকাশ। দূর থেকে আসা ফুলের সতেজতা হারানো এবং অতিরিক্ত পরিবহন খরচের সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন একজন সফল ফুল চাষি। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ইউটিউব দেখে চাষের কলাকৌশল রপ্ত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম “রাজন্যা ফ্লাওয়ার্স গার্ডেন অব বাঘাইছড়ি”-এর মাধ্যমে বাজারজাতকরণ তার আধুনিক মননশীলতার পরিচয় দেয়।

মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিয়োগে শুরু করা এই লড়াইয়ে তিনি ইতোমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখেছেন। তিন পার্বত্য জেলাজুড়ে নিজের উৎপাদিত ফুল ছড়িয়ে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা পাহাড়ি নারীদের স্বনির্ভর হওয়ার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থান সত্ত্বেও জুশি চাকমার এই বাণিজ্যিক পদযাত্রা পাহাড়ের নারীদের পরিশ্রমী ও উদ্যমী হওয়ার নতুন এক অনুপ্রেরণা।

জুশি চাকমা বলেন, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে এই নারী উদ্যোক্তার হাত ধরেই পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতিতে এক রঙিন বিপ্লব সাধিত হবে। তার এই সাহসী পথচলা প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে পাহাড়ের নারীরা আগামীর ডিজিটাল ও আধুনিক কৃষি অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন।

থানচিতে নিরাপদ পানি সংকটের অন্তত ১৫ গ্রামের বাসিন্দা

পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়

 

চিংথোয়াই অং মার্মা, থানচি (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

বান্দরবানের থানচি উপজেলার নেটওয়ার্কবিহীন দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি পল্লীগুলোতে এখন তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ পানির অভাবে সাঙ্গু নদীর তীরে গর্ত খুঁড়ে পানি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করছেন অন্তত ১৫টি গ্রামের বাসিন্দারা।

তারা জানান, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঝিরি ও ঝর্ণার পানিতেই কোনোভাবে দিন কাটলেও শুষ্ক মৌসুম এলেই ঘটে বিপত্তি। দুর্গমতার অজুহাতে বছরের পর বছর ধরে এসব গ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়েছে। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নেটওয়ার্ক না থাকায় অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা পেতেও কঠিন হয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, কোনো কোনো গ্রামের বাসিন্দাদের প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে ঝিরি ও সাঙ্গু নদীর তীরে গর্তখুঁড়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। নিরাপদ পানি সংকটের ভোগান্তির গ্রামগুলো হচ্ছে— হুকু খুমী পাড়া, সাখয়উ পাড়া, খেসাপ্রু পাড়া, ক্যমং হেডম্যান পাড়া, রুংসোলা পাড়া, মতি ত্রিপুরা পাড়া, চাইশৈউ পাড়া, ঙাসালাং পাড়া, উষাথোয়াই পাড়া, বাসিংঅং পাড়া, য়ংনং পাড়া, ক্রাহ্লাঅং পাড়া, অতিরাং পাড়া, অংহ্লা খুমী পাড়া ও জগৎচন্দ্র পাড়া।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শুস্ক মৌসুমে পাহাড়ে ঝিঁরিঝর্ণায় পানি শুকিয়ে যায়। ফলে সাঙ্গু নদীর তীরে গর্তখুঁড়ে পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করেছেন তারা। এসব পানি কাদামাটিযুক্ত ও অপরিশোধিত হওয়ায় তা পান করে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন শিশুসহ বয়স্ক বৃন্ধরা।

এলাকাবাসীদের ভাষ্যমতে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত থানচির দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায় পল্লীগুলোতে নলকূপ কিংবা ডীপ টিউবওয়েলের লাইন স্থাপন করা হয়নি। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলেই সাঙ্গু নদীর পানি ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনধারণ করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা শান্তিরানী ত্রিপুরা (২৮), ডানিয়াল খ্যাং (৩৩), মথিচন্দ্র ত্রিপুরা (৪২)সহ অনেকেই বলছেন, বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নাই। বাধ্য হয়ে নদীর ধারে গর্ত খুঁড়ে পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করছি। এসব এলাকায় প্রশাসনিক নজরদারিও সীমিত। ফলে বিশুদ্ধ পানি সংকট দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও কার্যকর কোনো টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের নজির নেই।

অন্যদিকে দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) বলেন, বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস স্থাপন ও প্রয়োজনীয় শোধন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে অনেকটাই নিরসন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, গর্ত খুঁড়ে যে পানি সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অপরিশোধিত। এ ধরনের পানি পান করলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তবে তাদের পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) স্বপন চাকমা জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রযুক্তিগতভাবে খুবই চ্যালেঞ্জিং। তবে পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রস্তাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় সম্ভাব্যতা যাচাই করে পাইপলাইনে জিপিএস স্থাপন করা যেতে পারে।

×