আলীকদমে হামের প্রাদুর্ভাবঃ রোগীর পাশে থেকে নিরলস কাজ করছে ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন
সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা,
আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি :
বান্দরবানের আলীকদম ও লামা উপজেলায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আলীকদম উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে হাম আক্রান্ত রোগীদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। ২২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমে দুর্গম এলাকার রোগীদের চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ ও সার্বিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় সরকারি টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য সহকারীদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত আলীকদম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৫ জন এবং লামা উপজেলায় ৫ জনসহ মোট ৬০ জন হাম আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা সেবার আওতায় এসেছে। এর মধ্যে ৪৭ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে ১৮ জন রোগী বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে আলীকদম, লামা ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।
ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন জানায়, তারা দুর্গম এলাকার হাম আক্রান্ত রোগীদের সরাসরি পাশে থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে। রোগীদের হাসপাতালে আনা-নেওয়া, চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, পরামর্শ এবং জটিল রোগীদের রেফার করতেও সংগঠনটির সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
নেতৃত্ব ও সমন্বয় :
সংগঠনটির সভাপতি সেথং ম্রো (উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, লামা) বলেন, “দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা রোগীদের পাশে থেকে কাজ করছি, যাতে কোনো রোগী অবহেলায় না থাকে এবং দ্রুত চিকিৎসা পায়।”
সাধারণ সম্পাদক পাতলাই ম্রো (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, “স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আলীকদম ও লামার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।”
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেনথাব ম্রো (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, “মাঠ পর্যায়ে প্রতিটি রোগীর খোঁজখবর রাখা, হাসপাতালে ভর্তি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আমরা নিরলসভাবে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”
কোষাধ্যক্ষ মেনতং ম্রো জানান, “সংগৃহীত অনুদান স্বচ্ছতার সাথে রোগীদের চিকিৎসা, পরিবহন ও প্রয়োজনীয় খরচে ব্যয় করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি সহযোগিতা সঠিকভাবে কাজে লাগে।”
নারী বিষয়ক সম্পাদক কারসিং ম্রো (এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, চট্টগ্রাম) বলেন, “নারী ও শিশু রোগীরা যাতে নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় সেবা পায়, সেজন্য আমরা বিশেষভাবে কাজ করছি এবং তাদের পাশে থেকে মানসিক সহায়তাও প্রদান করছি।”
এছাড়া সভাপতি আরও বলেন, “এই মানবিক কার্যক্রম সফল করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা দুর্গম এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবো এবং এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারবো।”
লামা হাসপাতাল সমন্বয় :
ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের পাশাপাশি লামা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে “বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন” লামা শাখার প্রতিনিধিত্বে ক্রইঙন ম্রো ও প্রেনপং ম্রো সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বিশেষ কার্যক্রম টিম :
ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের একটি দায়িত্বশীল টিম মাঠ পর্যায়ে সরাসরি রোগীদের পাশে থেকে কাজ করছে। এই টিমে রয়েছেন—পারাও ম্রো,মাংইন ম্রো, মেনরিং ম্রো, মেনতে ম্রো, পারিং ম্রো, চামলে ম্রো, রাংরেং ম্রো, রেংকুর ম্রো, পুষা ম্রো, লেংরাও ম্রো, রেংঅং ম্রো, মানিক ম্রো, মাংরুম ম্রো, থংতান ম্রো এবং প্রেনপং ম্রো।

আর্থিক সহায়তা ও ব্যয় :
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া কার্যক্রমে এ পর্যন্ত মোট ১,৯১,৭০৮.৮০ টাকা অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছে, যা রোগীদের চিকিৎসা, পরিবহন ও প্রয়োজনীয় সেবায় ব্যয় করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্গম এলাকায় হাম রোগ মোকাবেলায় ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের এই মানবিক উদ্যোগ একটি কার্যকর উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও প্রগতিশীলভাবে পরিচালিত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।












