দুর্গম মাংতং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিত ও অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা
মথি ত্রিপুরা, রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি :
বান্দরবানের দুর্গম রুমা উপজেলার ৪নং গালেংগ্যা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মাংতং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ এবং অবকাঠামোগত সংকটের অভিযোগ উঠেছে। এতে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত মাং তং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০১৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তারা হলেন— এংলাই ম্রো (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক), তাপস চাকমা (সহকারী শিক্ষক), রিয়াজুল ইসলাম (সহকারী শিক্ষক-বদলি) এবং নুহ্লাপ্রু মারমা (পি.টি.আই)।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন এবং নিয়মিত পাঠদান পরিচালনা করেন না। স্থানীয় অভিভাবকদের দাবি, কোনো কোনো শিক্ষক দুই থেকে পাঁচ মাসে মাত্র এক বা দুইবার বিদ্যালয়ে আসেন।

পাড়া কারবারির ছেলে এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের স্কুলের অবস্থা খুব খারাপ। স্কুলের ঘর দেখলে সত্যি চোখে পানি আসে। ঠিকমতো ক্লাস হয় না। শিক্ষকরা মাসের পর মাস স্কুলে আসে না। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও খুব কম আসেন। আরেক অভিভাবক পাংপাও ম্রো বলেন, এংলাই ম্রো পাঁচ মাসে একবার এসেছেন, কিন্তু ক্লাস না করেই চলে গেছেন। অন্য শিক্ষকরাও দুই-তিন মাসে একবার করে আসে। চারজন শিক্ষকেরই একই অবস্থা।
গত সোমবার (১১ মে) সম্প্রতি বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিবেদক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন শিক্ষককে অনুপস্থিত দেখতে পান। শুধু সহকারী শিক্ষক তাপস চাকমার সঙ্গে দেখা হয়। জানা যায়, গত ৯ মে শনিবার থেকে উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ে প্রথম সাময়িক (১ম প্রান্তিক মূল্যায়ন) পরীক্ষা শুরু হলেও মাং তং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা শুরু হয় দুই দিন পর, ১১ মে সোমবার।
এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক তাপস চাকমা বলেন, যথাসময়ে প্রশ্নপত্র হাতে না পাওয়ার কারণে পরীক্ষা শুরু করতে পারিনি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এংলাই ম্রো আমাকে পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি আসবেন না বলে জানিয়েছেন। তাই আমি একাই পরীক্ষা নিচ্ছি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এংলাই ম্রোর বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের সমস্যা এবং শিক্ষকদের অনুপস্থিতির বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে পূর্বের স্কুল কমিটির সভাপতিকে গোপনে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে অভিযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আরেকজন অভিভাবক বলেন, আগে আমার সন্তানদের এই স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। পরে আর রাখিনি। কারণ এখানে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাইরে স্কুলে ভর্তি করিয়েছি।
সহকারী শিক্ষক তাপস চাকমা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, বিদ্যালয়ের ভবন খুবই জরাজীর্ণ। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, টয়লেট নেই, অফিস কক্ষ নেই, নোটিশ বোর্ড নেই, আলমারি নেই। পর্যাপ্ত বেঞ্চ, টেবিল ও চেয়ারও নেই। এসব বিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছে এই প্রতিবেদককে।

এ বিষয়ে রুমা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ চিরাণ বলেন, একজন অভিভাবক আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমনকি বেতনও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক-দুই বছর আগে বিদ্যালয় ভবনের জন্য বাজেট এসেছিল। কিন্তু দুর্গম এলাকা হওয়ায় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারেরা কাজ করতে আগ্রহ দেখাননি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে টিনশেড ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য অফিসিয়াল নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।












