পাহাড়ের অদম্য কন্যারা : জুমের ঢাল থেকে বিজয়ের সবুজ গালিচায়
ছবি- প্রতিকী
ছন্দ সেন চাকমা, চীফ ফটোগ্রাফার ও কলামিস্ট :
আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি বিশেষ দিন। কিন্তু বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে যে মেঘলা পাহাড়ের সারি, সেখানে নারী দিবস মানে কেবল একটি তারিখ নয়; সেখানে নারী দিবস মানে এক অবিরাম অস্তিত্বের লড়াই। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যে রক্তিম সূর্য ওঠে, সেই সূর্যের প্রথম আলো পড়ে একদল লড়াকু নারীর ঘর্মাক্ত কপালে। তারা আমাদের আদিবাসী জুমিয়া নারী—যাঁরা একদিকে ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে আধুনিক বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।
জুমের অর্থনীতি ও জীবনসংগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে ‘জুমিয়া’ শব্দটি কেবল একটি পরিচয় নয়, এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের মহাকাব্য। কাক ডাকা ভোরে যখন কুয়াশার চাদর পাহাড়কে ঢেকে রাখে, তখন থেকেই শুরু হয় জুমিয়া নারীদের জীবনযুদ্ধ। পিঠে থুরুং (ঝুড়ি) বেঁধে দুর্গম পাহাড়ের ঢালে তাঁদের যে পদযাত্রা, তা মূলত সচল রাখে পাহাড়ের আদিম ও অকৃত্রিম জুম অর্থনীতিকে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা—সবখানেই নারী। কেবল কৃষি কাজই নয়, কোমর তাঁতে নিজের পিনন-হাদি বোনা থেকে শুরু করে সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি তাঁরা সামলান নিপুণ হাতে। তাঁরাই পাহাড়ের বস্তুতন্ত্রের অঘোষিত রক্ষক। কোন লতা ঔষধি, কোন বৃক্ষ পাহাড়কে ধস থেকে রক্ষা করে—এই আদিম জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জুমিয়া নারীরাই বহন করে চলেছেন। অথচ এই কঠোর শ্রমের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে তাঁদের স্বীকৃতির জায়গাটি আজও অনেকখানি ধূসর।
খেলার মাঠে পাহাড়ের জয়গান: এক নতুন বিপ্লব তবে গত কয়েক বছরে পাহাড়ের এই দৃশ্যপটে যুক্ত হয়েছে এক অভাবনীয় সোনালী অধ্যায়। পাহাড়ের ঢালে যে পা-গুলো একদিন পাথুরে পথ পাড়ি দিত, সেই পা-গুলোই আজ ফুটবল আর ক্রিকেটের সবুজ গালিচায় প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করছে। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বর্তমান যে জোয়ার, তার মূল কারিগর আমাদের পাহাড়ের কন্যারা। ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, কৃষ্ণা রানী সরকার, মারিয়া মান্দা বা মনিকা চাকমাদের নাম আজ প্রতিটি বাঙালির ড্রয়িংরুমে পরিচিত। সাফের (SAFF) শিরোপা জয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো—সবখানেই এই আদিবাসী নারীদের অদম্য জেদ কাজ করেছে।
দুর্গম পাহাড়ের জরাজীর্ণ মেঠোপথ থেকে উঠে এসে তাঁরা আজ দেশের ‘পোস্টার গার্ল’। তাঁদের এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করে যে, আদিবাসী নারীরা কেবল শ্রমের কারিগর নন, তাঁরা মেধা আর সাহসেরও আকর। তারা শিখিয়েছেন কীভাবে সীমাবদ্ধতাকে পায়ের জাদুতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হয়। অদম্যদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই শুভক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সব বাবা-মায়েদের প্রতি, যাঁরা দারিদ্র্য আর সামাজিক বাধার দেয়াল টপকে তাঁদের মেয়েদের মাঠে পাঠিয়েছেন। আমরা অভিনন্দন জানাই আমাদের সেই সব আদিবাসী ক্রীড়াবিদদের, যাঁরা নিজেদের রক্ত আর ঘাম দিয়ে প্রমাণ করেছেন—পাহাড় কেবল শান্ত নয়, পাহাড় জানে কীভাবে গর্জে উঠতে হয়। পাহাড়ের সেই সব নক্ষত্রদের প্রতি আমাদের স্যালুট! আপনাদের প্রতিটি গোল, প্রতিটি জয় আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আপনারা কেবল গোলবার কাঁপাননি, বরং আমাদের সমাজের সংকীর্ণ মানসিকতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছেন।

উপসংহার: স্বীকৃতির দায়বদ্ধতা পরিশেষে বলতে চাই, পাহাড়ের নারীদের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন। জুম চাষের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ক্রীড়া ও শিক্ষায় তাঁদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা আজ সময়ের দাবি। জুমিয়া নারীরা দয়া চান না, তাঁরা চান সমমর্যাদা আর শ্রমের উপযুক্ত সম্মান। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—পাহাড়ের সেই সাহসী হাতগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। জুমের ফসল থেকে শুরু করে খেলার মাঠের ট্রফি—সবখানেই যেন আমাদের আদিবাসী বোনদের জয়জয়কার থাকে। পাহাড়ের এই অদম্য কন্যারা ভালো থাকলেই ভালো থাকবে আমাদের বাংলাদেশ। পাহাড়ের প্রতিটি লড়াকু নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও নারী দিবসের শুভেচ্ছা।



















